ঊনিশশো একাশি সালটি কলকাতার জন্য এক ঐতিহাসিক সময়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চলছিল পাতাল রেলের নির্মাণকাজ। রাস্তা বন্ধ, ক্রেন, ড্রেজার ও ড্রিলিং মেশিনের অবিরাম শব্দে মুখরিত নগরী—দিনরাত চলছে কাজ। আমাদের প্রিয় শহর তখন নতুন যুগে পা রাখতে চলেছে, যখন কলির কলকাতার পাতালপ্রবেশ ঘটবে রেলগাড়ির মাধ্যমে।
একসময় কলকাতার রাস্তায় হাতির চলাচল ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। ১৭৯৫ সালের ১৬ এপ্রিল বেঙ্গল হরকরার খবরে উল্লেখ আছে—এসপ্লানেড রো’তে হাতি দেখে খেপে যাওয়া ঘোড়ার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল একটি ঘোড়ার গাড়ি। এ ঘটনাই প্রমাণ করে, সে সময় হাতি ছিল কলকাতার অন্যতম পরিবহন মাধ্যম।
১৮০৫ সাল নাগাদ শহরে ঘোড়ার গাড়ি এলেও তা ছিল সীমিত সংখ্যক। পালকি ছিল তৎকালীন প্রধান যান, যা কেবল সাদা চামড়ার মানুষের জন্য সংরক্ষিত। গরীব নেটিভরা শুধু বাহক হিসেবেই কাজ করত। ১৮২৭ সালের ঐতিহাসিক পালকি ধর্মঘট ছিল কলকাতার শ্রমজীবীদের প্রথম বড় আন্দোলন। ধর্মঘটের ফলে ইংরেজ সাহেবরা বিপাকে পড়েন, কারণ পালকি ছাড়া তাদের যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সময়েই ব্রাউন লো নামে এক ইংরেজ পালকিতে চাকা ও ঘোড়া জুড়ে তৈরি করেন প্রথম ব্রাউন বেরি ঘোড়ার গাড়ি।
আঠারো শতকের চল্লিশের দশক থেকেই ঘোড়ার গাড়ি হয়ে ওঠে কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন। বিলেত থেকে আসা কারিগরেরা ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিট ও চাঁদনি চকে কোচ তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠে আস্তাবল ও লোহার জলাধার। ১৭৯০ সালের রেকর্ডে চ্যাণ্ডলার, গ্রেন্জ, স্টুয়ার্ট, ওয়াটসন প্রমুখ কোচমেকারের নাম পাওয়া যায়। বৌবাজারে ক্রিস্টোফার ডেক্সটারের বিশাল আস্তাবলও ছিল বিখ্যাত।
স্টুয়ার্ট কোম্পানির বিজ্ঞাপনে ১৭৮৫ সালে একজোড়া ঘোড়াসহ ফিটন বিক্রির কথা বলা হয়েছিল। দাম ছিল কেবল ধনী সম্প্রদায়ের নাগালের মধ্যে—দু’হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। ঘোড়ার গাড়ির নামও ছিল বৈচিত্র্যময়—জুড়ি, ল্যান্ডো, চৌঘুড়ি, ল্যান্ডোলেট, ফিটন, ব্রাউন বেরি, ব্রুহাম, বগি, সারা ব্যাংক, ডাক গাড়ি, জাউন গাড়ি প্রভৃতি।
ঘোড়ার গাড়ির ধরন ও ব্যবহার: ল্যান্ডো ও ব্রুহাম: কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য, ভাড়ায় খাটত না।কেরাঞ্চি, পালকি গাড়ি, ব্রাউন বেরি, ছক্কোড়: ভাড়ার জন্য ব্যবহৃত।কেরাঞ্চি: ছ’ঘোড়ায় টানা হতো, সাধারণ মানুষের শেয়ার ব্যবস্থায় যাতায়াতের মাধ্যম।বগি গাড়ি: ঢাকনাসহ তৈরি, রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য।
স্টুয়ার্ট বগি মধ্যবিত্তদের কাছে জনপ্রিয় ছিল, আর কেরাঞ্চি ও ছক্কোড় ছিল চাকুরিজীবীদের ভরসা।
কুক অ্যান্ড কোম্পানি‘র বিজ্ঞাপনে দেখা যায়—একজোড়া ঘোড়া: দৈনিক ১০ টাকা / মাসে ১৫০ টাকা, একজোড়া ঘোড়াসহ গাড়ি: দৈনিক ১৬ টাকা / মাসে ২৫০ টাকা, একঘোড়া: দৈনিক ৫ টাকা / মাসে ১৫০ টাকা
গাড়ি ও ঘোড়ার দাম: ১৮৪৩ সালে একখানা বগি গাড়ি: ৮০০–১১০০ টাকা, পালকি গাড়ি: ৯০০–১৮০০ টাকা,বিলিতি ঘোড়া: ৫০০ টাকার কমে পাওয়া যেত না
হাতি থেকে পালকি, পালকি থেকে ঘোড়ার গাড়ি—কলকাতার পরিবহন ইতিহাসে প্রতিটি ধাপই যুগান্তকারী। কিন্তু ঊনিশশো একাশিতে পাতাল রেলের নির্মাণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের গতিশীলতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। শহরের আকাশ ও মাটির নিচে একসাথে কাজ চলতে থাকে—এটাই কলকাতার আধুনিক নগর পরিকল্পনার সূচনা।
পাতাল রেল শুধু সময় বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দেয়নি, বরং কলকাতার যানজট ও পরিবহন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথও খুলে দিয়েছিল। এই প্রকল্পের ফলে শহরের পরিবহন ইতিহাসে যুক্ত হয় এক নতুন অধ্যায়, যেখানে গতি, আরাম ও আধুনিক প্রযুক্তি একসাথে কাজ করে।
ঊনিশশো একাশি শুধু পাতাল রেলের সূচনা বছরই নয়, বরং কলকাতার পরিবহন ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো সময়। হাতি, পালকি, ঘোড়ার গাড়ি থেকে শুরু করে পাতাল রেল—প্রতিটি অধ্যায় শহরকে দিয়েছে নতুন পরিচয়। আমরা যদি অতীতের দিকে তাকাই, দেখতে পাবো এই শহরের পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তন আসলে কলকাতার প্রাণস্পন্দনেরই প্রতিচ্ছবি।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: রিফাত-বিন-ত্বহা | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১১ আগস্ট ২০২৫


