বাংলাদেশে হকির ইতিহাসে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের নাম আমরা শুনেছি, তবে তাদের মধ্যে মোঃ হাসান রনি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। যশোরের খড়কিতে জন্ম নেওয়া এই খেলোয়াড় তাঁর প্রতিভা, নিবেদন ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কেবল স্থানীয় পর্যায়েই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও হকির পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
১৯৭২ সালের ২৫শে আগস্ট যশোর শহরের খড়কিতে জন্মগ্রহণ করেন মোঃ হাসান রনি। তাঁর পিতার নাম ছিলেন এ কে এম রেজাউল ইসলাম। রনি দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর অগাধ আগ্রহ ছিল। শিক্ষা জীবনে তিনি বিএ ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তবে শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার কখনোই কমেনি।
জেলা স্কুল থেকে আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে রনির হকির ক্যারিয়ার শুরু হয়। বিদ্যালয় জীবনের সেই প্রথম প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকেই তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। দ্রুতই তিনি কোচ ও সহপাঠীদের নজরে আসেন এবং হকির প্রতি তাঁর ভিন্নধর্মী দক্ষতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
১৯৮৭ সাল থেকে রনি যশোর হকি লীগে খেলা শুরু করেন। শুরু থেকেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে। যশোর লীগে তিনি “আসাদ স্মৃতি সংঘ” দলের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয়। পরবর্তীতে তিনি “ইনস্টিটিউট টাউন ক্লাব”-এর অধিনায়ক (ক্যাপ্টেন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তাঁর নেতৃত্ব গুণ আরও পরিস্ফুট হয়।
হকির প্রতি ভালোবাসা ও প্রতিভার কারণে রনি শুধু যশোরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি খেলেছেন—ফরিদপুর লীগে “সবুজ সেনা” দলের হয়ে।রাজশাহী লীগে “জাগ্রত সংঘ”-এর পক্ষে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর খেলার মান উন্নত করতে সহায়ক হয়েছিল এবং তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর সোপান তৈরি করেছিল।
১৯৯০ সালে তিনি ঢাকা হকি লীগে প্রবেশ করেন। প্রথমে তিনি দ্বিতীয় বিভাগের “বাংলাদেশ স্পোর্টিং” দলের হয়ে খেলেন। একই বছর তাঁর দল চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি এই দলে নিয়মিত খেলেন।
এই সময়কালটি রনির জীবনে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার মতো প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করা সহজ কাজ ছিল না, কিন্তু রনি তাঁর দক্ষতা, দৃঢ়তা ও পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দর্শক, কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থা অর্জন করেন।
১৯৯৫ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত রনি নিয়মিত খেলেছেন বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল “মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব”-এর পক্ষে। মোহামেডান সবসময়ই দেশের অন্যতম শক্তিশালী ক্লাব হিসেবে পরিচিত, এবং সেখানে খেলা প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্যই একটি গর্বের বিষয়।
রনি এই সময়ে দলে একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি শুধু গোলের সুযোগ তৈরি করতেন না, বরং দলকে অনুপ্রাণিত করতেন জয়ের পথে এগিয়ে যেতে।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা দলের হয়ে রনি নিয়মিত খেলেন। নিজ জেলার দলের হয়ে খেলার মধ্যে যে এক ধরনের আবেগ ও গর্ব থাকে, রনি সেটি গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। এই সময়ে তাঁর পারফরম্যান্স যশোরের ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
খেলোয়াড় জীবনের পাশাপাশি মোঃ হাসান রনি সেনাবাহিনীর ২৭ কোরের কোচের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ সময়। সেনাবাহিনীর মতো একটি সংগঠনে কোচিং করানো সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলা, কৌশলগত দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ। রনি তাঁর কোচিংয়ের মাধ্যমে বহু প্রতিভাবান হকি খেলোয়াড় তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব মোহামেডান ও আবাহনী। মোহামেডানের পর রনি দীর্ঘ সময় ঢাকা হকি লীগে “আবাহনী লিমিটেড”-এর পক্ষে খেলে আসছেন। আবাহনীর জার্সি গায়ে মাঠে নামা তাঁর জন্য ছিল আরেকটি বিশেষ অধ্যায়। এখানে তিনি দলের একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে সাফল্যের সাথে খেলে চলেছেন বহু বছর।
মোঃ হাসান রনির খেলোয়াড়ি জীবনের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল: শৃঙ্খলা: মাঠে ও মাঠের বাইরে সবসময় তিনি নিয়ম মেনে চলতেন।নেতৃত্ব: টিমের অধিনায়ক হিসেবে দলকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতেন।কৌশলগত দক্ষতা: প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারতেন অনায়াসে।অনুপ্রেরণা: তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য তিনি ছিলেন এক প্রেরণার উৎস।
রনি শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়ই নন, বরং তিনি বাংলাদেশের হকিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, কোচিং এবং ক্লাব পর্যায়ে দীর্ঘদিন খেলা—সব মিলিয়ে তিনি দেশের হকি ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছেন।
মোঃ হাসান রনি কেবল যশোর নয়, গোটা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের একটি উজ্জ্বল নাম। আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে ঢাকা লীগের বড় বড় দলগুলোতে খেলা, জেলা দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব, সেনাবাহিনীর কোচের দায়িত্ব এবং আবাহনী লিমিটেডে দীর্ঘ সময় খেলা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন একটি অনুপ্রেরণার গল্প।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যদি তাঁর জীবনের মতো নিবেদন, শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে, তবে ভবিষ্যতে হকি এবং অন্যান্য খেলায় আরও বড় সাফল্য অর্জিত হবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২৩ আগস্ট ২০২৫


