যশোরের ক্রীড়া ইতিহাসে মোঃ হাসানুজ্জামান এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি প্রথমে ছিলেন একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড়, পরে ১৯৮৪ সাল থেকে হ্যাণ্ডবলের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে আজীবন এই খেলায় নিজেকে নিবেদিত করেন। খেলোয়াড়ি জীবন থেকে প্রশিক্ষক হয়ে ওঠার যে অনন্য যাত্রা, তা তাকে যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করেছে।
মোঃ হাসানুজ্জামানের জন্ম ১৯৫৭ সালে যশোর সদরের বালিয়াডাঙ্গা চাঁদপাড়া গ্রামে। পিতার নাম ইমান আলী বিশ্বাস। তিনি ছিলেন চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে চতুর্থ। শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার আকর্ষণ ছিল প্রবল। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন। শিক্ষাজীবনে তিনি বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি যোগ দেন যশোর বালিয়াডাঙ্গা প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে। শুধু শিক্ষকই নন, বরং ক্রীড়াক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং তাদের দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন এক সাহসী পথিকৃৎ।
হাসানুজ্জামান প্রথমে বাস্কেটবলে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।তিনি সম্মিলনী স্কুলের হয়ে খেলতেন এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রানার্স আপ হন।১৯৮১, ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে যশোর জেলা বাস্কেটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।এই সময় তার নেতৃত্বগুণ ও খেলোয়াড়ি দক্ষতা যশোর বাস্কেটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
১৯৮৪ সাল থেকে হ্যাণ্ডবলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মোঃ হাসানুজ্জামান প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।১৯৮৬ সালে প্রগতি গার্লস স্কুলে চাকরি নেওয়ার পর তিনি প্রথমবারের মতো মেয়েদের হ্যাণ্ডবল দল গঠন করেন।১৯৮৮ সালে বি.পি.এড ডিগ্রি অর্জন করে ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রশিক্ষক হিসেবে আরও যোগ্য হয়ে ওঠেন।
হাসানুজ্জামানের প্রশিক্ষণে যশোর ও বাংলাদেশের হ্যাণ্ডবল নতুন সাফল্যের স্বাদ পায়।১৯৯২ সালে জাতীয় রানার্স আপ, ১৯৯৩ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন, ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে অঞ্চল রানার্স আপ, ১৯৯৭ ও ১৯৯৯ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন।
এছাড়া বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাতেও তার দল সাফল্য অর্জন করে—১৯৯৬ সালে অনুর্ধ্ব-১২ থেকে ১৬ বছর বিভাগে রানার্স আপ,১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালে অনুর্ধ্ব-১৯ বছর বিভাগে রানার্স আপ।
প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েদের দলকে তিনি দেশের অন্যতম শক্তিশালী দলে রূপান্তরিত করেন।২০০০ সালে বাংলাদেশ রানার্স আপ, ২০০১ সালে রানার্স আপ, ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন, এই ধারাবাহিক সাফল্য তার প্রশিক্ষণদানের দক্ষতারই প্রমাণ।
তিনি শুধু স্কুল বা জেলা নয়, বরং সেনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দলকেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।১৯৯৪ সালে ১৬ বেঙ্গল রেজিমেন্ট যশোর ডিপ চ্যাম্পিয়ন হয় তার প্রশিক্ষণে।১৯৯৭ সালে খুলনা নিউজ প্রিন্ট মিলস ক্লাব, যশোর বি.ডি.আর ১৯৮৫ দল – এই দলগুলোকেও তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
১৯৮৫ সালে তিনি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে ঢাকা এনএসসিবি (বর্তমানে জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড) আয়োজিত প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি সুইডিশ কোচ মি. ওয়েল, আজগর আলী খান ও নজরুল ইসলামের কাছ থেকে হ্যাণ্ডবলের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেন। একই সঙ্গে তিনি রেফারির প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন।
তার হাতে গড়ে ওঠা বহু খেলোয়াড় জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন। এর মধ্যে অন্যতম রুমা এবং আরও অনেকে, যারা পরবর্তীতে দেশের হ্যাণ্ডবল ইতিহাসে নিজেদের স্বাক্ষর রেখেছেন।
তার অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির যশোর শাখা তাকে বর্ষসেরা হ্যাণ্ডবল ক্রীড়া প্রশিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করে। এছাড়া তিনি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার হ্যাণ্ডবল উপ-পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মোঃ হাসানুজ্জামান ছিলেন যশোরের ক্রীড়া ইতিহাসের এক সত্যিকারের নায়ক। একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড় থেকে হ্যাণ্ডবল কোচ – তার জীবনযাত্রা নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দেয়। তার অবদান শুধু যশোর নয়, সমগ্র বাংলাদেশের হ্যাণ্ডবল ইতিহাসে গৌরবের অধ্যায় হয়ে থাকবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৬ আগস্ট ২০২৫


