বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মাহ্ফুজুল হক রিন্টু, যিনি তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ও কৌশলী খেলার মাধ্যমে দেশের হকি প্রেমীদের মন জয় করেছিলেন। মাঠে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে তার দক্ষতা, গোল করার ক্ষমতা এবং নেতৃত্বগুণ তাকে করে তুলেছিল অনন্য।
মাহ্ফুজুল হক রিন্টুর জন্ম ১৯৬৭ সালের ১৫ই মার্চ যশোর শহরের খড়কি এলাকায়। পিতা আমিনুল হক ছিলেন পরিবারের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। রিন্টুর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার শুরুলিয়া গ্রামে। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হিসেবে তিনি সবার আদরের ছিলেন।
শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। পড়াশোনায়ও তিনি ছিলেন মনোযোগী, যার ফলশ্রুতিতে তিনি এম. কম. (ব্যবস্থাপনা) ডিগ্রি অর্জন করেন।
খেলাধুলার পাশাপাশি রিন্টু গড়ে তুলেছিলেন এক সফল পেশাগত ক্যারিয়ার। তিনি কর্মজীবনে দায়িত্ব পালন করেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠানে, যেমন: প্রগ্রেসিভ ক্রেডিট কোঅপারেটিভ ব্যাংক, স্ক্যান সিমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল লিঃ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, সিমেন্স বাংলাদেশ
এছাড়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন সিমেন্স ইউএসএ এবং হাপাগ-লয়েড এ। বর্তমানে তিনি একটি আমেরিকান প্রতিষ্ঠানে সাপ্লাই চেইন বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন।
রিন্টুর হকি ক্যারিয়ার শুরু হয় যশোর জিলা স্কুল থেকে, যেখানে তিনি আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এর পর ধীরে ধীরে তিনি যশোর হকি লীগের এক অপরিহার্য খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। তিনি খেলেছেন একাধিক বিখ্যাত ক্লাবে, যার মধ্যে রয়েছে: কিশোর ক্লাব,আসাদ স্মৃতি সংঘ,যশোর পুলিশ ক্লাব, সার্কিট হাউস ক্লাব। প্রতিটি মৌসুমেই তিনি তার দলকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন।
যশোরের সাফল্যের পর রিন্টু ঢাকায় চলে আসেন এবং খেলেন বেশ কিছু প্রভাবশালী ক্লাবে: আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব (১৯৮২-৮৩) – প্রথম বিভাগে তার দক্ষতা নজর কাড়ে।ওয়ারী ক্লাব (১৯৮৫-১৯৯৩) – এই সময় তার খেলার মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাব (১৯৯৪-১৯৯৫) – ১৯৯৪ সালে তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।যশোর জেলা দলের হয়ে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নিয়মিত খেলেছেন।১৯৮৭ সালে যুব দলের অধিনায়ক ছিলেন এবং রানার্স-আপ হয়েছিলেন।এক বছর যশোর হকি লীগে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন।একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সাফল্য।
১৯৯৭ সালে রিন্টু খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর নেন। তবে তিনি হকি জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকেন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে।২০০১-২০০২ সালে তিনি “ওয়ারী ক্লাব”-এর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।২০০১ সালে তার ব্যবস্থাপনায় দল ঢাকা প্রথম বিভাগ লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়।
রিন্টুর ক্রীড়াজীবন নানা সম্মাননায় ভরপুর: যশোর হকি লীগে “সেরা প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়” পুরস্কার।বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলে বারবার চ্যাম্পিয়নশিপ জয়।ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে একাধিকবার সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে স্বীকৃতি।
রিন্টুর খেলার ধরন ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও কৌশলপূর্ণ। সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে তিনি: দ্রুত গতিতে বল নিয়ে এগিয়ে যেতেন।নিখুঁত পাস এবং গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখতেন।প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে চূড়ান্ত মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।তার খেলার নৈপুণ্য শুধু সতীর্থদেরই নয়, দর্শকদেরও উজ্জীবিত করত।
রিন্টুর অবদান কেবল একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং একজন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও মূল্যবান। তার খেলার ধারা ও নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়। বিশেষ করে যশোর জেলার হকি উন্নয়নে তার অবদান আজও ক্রীড়াপ্রেমীরা স্মরণ করেন।
খেলার পাশাপাশি রিন্টু সবসময় পরিবার ও পেশাগত দায়িত্বের প্রতি সচেতন ছিলেন। সবার কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন বিনয়ী, পরিশ্রমী এবং আন্তরিক মানুষ হিসেবে।
মাহ্ফুজুল হক রিন্টু শুধু একজন দক্ষ হকি খেলোয়াড়ই নন, তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। তার সংগ্রামী জীবন, অসাধারণ খেলাধুলা এবং সাফল্যের গল্প আগামী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


