বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে অনেক গর্বের নাম রয়েছে, তাদের মধ্যে এক অনন্য নাম মোঃ মাসুদুল হক ডিজু। যশোরের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ হকি ও ফুটবল উভয় খেলাতেই সমান দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। তার অসাধারণ প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং অনন্য খেলোয়াড়ি নৈপুণ্যের কারণে তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ স্থান অধিকার করেছেন।
মোঃ মাসুদুল হক ডিজু জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৪ সালে যশোর শহরের ভোলা ট্যাংক রোডে। তার পিতা ছিলেন এ্যাডভোকেট রেজাউল হক এবং গ্রামের বাড়ি মাগুরার আলাইপুরে। পরিবারে তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে ডিজু ছিলেন সবার ছোট। তার শৈশব কেটেছে যশোর শহরের প্রাণবন্ত পরিবেশে, যেখানে খেলাধুলার প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল খুব অল্প বয়স থেকেই।
ডিজুর শিক্ষাজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত — তিনি আই কম পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তবে স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলায় তার দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যশোর জেলা স্কুলে পড়াকালীন তিনি হকি ও ফুটবল উভয় খেলাতেই সক্রিয় ছিলেন।
হকিতে একবার চ্যাম্পিয়ন দলের হয়ে খেলার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। ফুটবলেও তার নৈপুণ্য প্রশংসিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে তাকে আরও বড় ক্রীড়া আসরে অংশ নেওয়ার সুযোগ এনে দেয়।
ডিজুর হকি ক্যারিয়ার শুরু হয় স্থানীয় পর্যায়ে, কিন্তু দ্রুতই তিনি নিজেকে দেশের প্রথম সারির খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন।যশোর লীগ হকি, ১৯৮৭-১৯৮৮ মৌসুমে “বিমান” দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন।১৯৮৯-১৯৯০ মৌসুমে “আসাদ স্মৃতি সংঘ” দলের হয়ে আবারও জেলা লীগ চ্যাম্পিয়ন।ঢাকায় সাফল্য, ১৯৮৭ সালে আবাহনী ক্লাব-এর হয়ে প্রথম বিভাগ টুর্নামেন্টে রানার্স আপ।গোলরক্ষক হিসেবে তার দক্ষতা দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করে।১৯৭৯ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকার বিভিন্ন প্রথম বিভাগ হকি ক্লাবে খেলেছেন — এর মধ্যে রয়েছে আবাহনী ক্লাব, পিডব্লিউডি, ওয়াণ্ডারার্স ক্লাব, ও ওয়ারী ক্লাব।
গোলরক্ষক হিসেবে তার চটপটে প্রতিক্রিয়া, বল নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলী সেভ করার ক্ষমতা তাকে দলের অন্যতম ভরসাযোগ্য খেলোয়াড়ে পরিণত করেছিল।
হকির পাশাপাশি ফুটবলেও ডিজু সমানভাবে প্রতিভা দেখিয়েছেন।১৯৮১ সালে যশোর যুব দলে অংশ নেন এবং শিক্ষা বোর্ড দলে খেলেন।১৯৮২ সালে “মোহামেডান”, “আসাদ স্মৃতি সংঘ” ও “কিশোর ক্লাব”-এর হয়ে ফুটবল খেলেন।
ফুটবলে তার খেলার ধরণ ছিল শক্তিশালী ও কৌশলগত, যা তাকে মাঠে সবসময় আলাদা করে তুলত।
পড়াশোনা শেষে ডিজু ব্যবসায়িক জীবনে প্রবেশ করেন। ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও খেলাধুলার সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট ছিল। তিনি ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নবীন প্রজন্মকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করতেন।
মোঃ মাসুদুল হক ডিজু শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড় নন, তিনি ক্রীড়াপ্রেমী সমাজের জন্য একটি প্রেরণার উৎস। তার খেলার সময়কার অভিজ্ঞতা, মাঠে অবিচল মনোবল এবং ক্রীড়াশৃঙ্খলা নবীন খেলোয়াড়দের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।দেশের বিভিন্ন স্থানে হকি ও ফুটবলের প্রচার-প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।তরুণদের ক্রীড়ায় যুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে মোঃ মাসুদুল হক ডিজু-এর অবদান অনস্বীকার্য। হকি ও ফুটবল উভয় খেলায় তার সাফল্য এবং দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে নিবেদন, পরিশ্রম এবং ভালোবাসা দিয়ে যেকোনো খেলোয়াড় দেশের জন্য গর্ব বয়ে আনতে পারেন।
তার জীবনী থেকে আমরা শিখি — প্রতিভা শুধু জন্মগত নয়, এটি লালন করতে হয় কঠোর অনুশীলন ও দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়রা তার জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৫


