শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
মোঃ ইমামুল হাসান তোতা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম, যিনি হকি খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৩ সালে, ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কালুখালী গ্রামে। তাঁর পিতা আব্দুস সালাম, যিনি নিজ এলাকায় সম্মানিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
শৈশবে তোতার বেড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশে। তিনি ছিলেন দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। পরিবারের সবার আদরের ধন তোতা ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলায় প্রবল আগ্রহী ছিলেন।
শিক্ষাজীবনের যাত্রা ও ক্রীড়ায় প্রথম পদচারণা
তোতার শিক্ষা শুরু হয় যশোর জেলার ঐতিহ্যবাহী যশোর জিলা স্কুলে। এখানেই তিনি প্রথম হকির প্রতি আগ্রহ দেখান এবং মাত্র ১৯৬৭ সালেই স্কুল পর্যায়ে আন্তঃস্কুল হকি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁর দক্ষতা, গতি এবং বল কন্ট্রোলে অতুলনীয় ক্ষমতা তাঁকে খুব দ্রুত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
শুধু প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেই থেমে থাকেননি, বিভাগীয় পর্যায়ে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। স্কুল জীবনে তাঁর হকি ক্যারিয়ারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
কলেজ জীবন ও আরও উচ্চতর ক্রীড়া অংশগ্রহণ
তোতা ১৯৬৯ এবং ১৯৭০ সালে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন খুলনা আজম খান কমার্স কলেজে। এ সময়েই তিনি খুলনা লিগে কলেজের হয়ে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানেও তাঁর হকি প্রতিভার বিকাশ ঘটে। খুলনার মাঠে তাঁর খেলার স্টাইল, শারীরিক সক্ষমতা এবং ট্যাকটিক্যাল প্ল্যান সবকিছুই তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে।
ঢাকা পর্ব: দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উত্তরণ
১৯৭৩ সালে তোতা পাড়ি জমান ঢাকা শহরে, যেখানে তিনি শুরু করেন দ্বিতীয় বিভাগীয় হকি লিগে খেলোয়াড় হিসেবে পথচলা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে, ১৯৭৫ সালেই তিনি জায়গা করে নেন প্রথম বিভাগের মর্যাদাপূর্ণ “দিলখুশা ক্লাব”-এ।
তিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দিলখুশা ক্লাবের হয়ে খেলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সোনালি অধ্যায়। ঢাকায় হকির শীর্ষ পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও পরিণত করে তোলে।
এই সময়েই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হকি টিমেও খেলেছেন। একজন ব্যবস্থাপনায় এম.কম ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী হয়ে খেলাধুলার সঙ্গে পড়ালেখার সমন্বয় ছিল তাঁর জীবনচর্চার এক দুর্দান্ত দৃষ্টান্ত।
জাতীয় পর্যায়ে যশোর জেলার প্রতিনিধিত্ব
তোতা ১৯৭৬ সালে যশোর জেলা দলের হয়ে রাজশাহীতে অংশগ্রহণ করেন, যা তাঁর জন্মস্থান ও শিকড়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রমাণ। জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে যশোরের প্রতিনিধিত্ব করাটা ছিল তাঁর জন্য এক গর্বের বিষয়।
যশোর জেলা টিমের হয়ে তিনি রাজশাহী মাঠে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন, যা সেই সময়কার হকি পরিমণ্ডলে আলোচিত হয়ে ওঠে।
কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন
খেলোয়াড়ি জীবনের পাশাপাশি তোতা পেশাগতভাবে যুক্ত ছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে। তাঁর কর্মজীবনও ছিল নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধে ভরপুর।
তিনি যশোর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডে বসবাস করতেন, যেখানে তিনি ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানেই তিনি একটি পরিপূর্ণ পারিবারিক জীবনযাপন করতেন, যা ছিল শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল।
তোতার অবদান ও প্রভাব
তোতার হকি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তিনি নিজ এলাকার যুবসমাজের জন্য এক আদর্শ রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন। স্কুল পর্যায়ে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায় পর্যন্ত তাঁর সাফল্যের ধারা এবং অনুপ্রেরণাদায়ী যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং একাগ্রতা থাকলে অসম্ভব কিছুই নয়।
বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে মোঃ ইমামুল হাসান তোতা একটি উজ্জ্বল নাম, যার খেলোয়াড়ি নৈপুণ্য, নৈতিকতা এবং শিক্ষা, সব মিলিয়ে তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
মোঃ ইমামুল হাসান তোতার জীবন কেবল একজন হকি খেলোয়াড়ের গল্প নয়, এটি একজন প্রতিভাবান বাঙালির সংগ্রামী ও সফল জীবনের চিত্রণ। যিনি হকির মাঠে যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনেও ছিলেন দৃঢ়, নিষ্ঠাবান এবং সম্মানিত।
আজকের দিনে আমাদের উচিত, এমনসব অগ্রজ ক্রীড়াবিদদের কৃতিত্বকে তুলে ধরা, যেন পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের জীবনগাঁথা থেকে শিক্ষা নিতে পারে, অনুপ্রেরণা পায় এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ৬ আগস্ট ২০২৫


