দেলোয়ার হোসেন খোকন বাংলাদেশের হকির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর জন্ম ১৯৫৮ সালের ১১ই জুলাই, যশোর শহরের খড়কী এলাকায়। তাঁর পিতা ছিলেন এ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা, একজন স্বনামধন্য আইনজীবী। শিক্ষা জীবন শেষ করেন বিএ ডিগ্রি নিয়ে। শৈশব থেকে খেলাধুলার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহই তাঁকে দেশের একজন কৃতী হকি খেলোয়াড় ও সংগঠক হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
ছাত্রজীবনে হকির প্রতি নিবেদন
দেলোয়ার হোসেন খোকনের হকির প্রতি ভালবাসা শুরু হয় ছাত্রজীবনেই। তিনি মুসলিম একাডেমী হাই স্কুল এবং যশোর এম এম কলেজ এর পক্ষে আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ হকি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। তাঁর চেষ্টায় দলগুলো একের পর এক সাফল্য পেতে থাকে, যা তাকে স্থানীয় হকি অঙ্গনে দ্রুত পরিচিত করে তোলে।
যশোর লীগে হকির সোনালী দিন
১৯৭৫-১৯৭৬ সালে যশোর লীগে তিনি ‘বাংলাদেশ বিমান’ দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। একই সময়ে তিনি ‘কিশোর ক্লাব’ এবং ‘আসাদ স্মৃতি সংঘ’ এর পক্ষ থেকেও হকি খেলেন এবং দলগুলোকে চ্যাম্পিয়ন করান। স্থানীয় লীগের এই সাফল্যই তাঁর দক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণের প্রমাণ বহন করে।
ঢাকা লীগে দাপুটে উপস্থিতি
দেলোয়ার হোসেন খোকন শুধু যশোর নয়, ঢাকার হকি মঞ্চেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৭৬ সালে ‘পিডব্লিউ ডি ক্লাব’ এর হয়ে প্রথম বিভাগ লীগে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ঢাকা ওয়াণ্ডারার্স ক্লাব’-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। এই সময়টিতে তাঁর নেতৃত্বে দল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিততে সক্ষম হয়।
জোনাল চ্যাম্পিয়ন হিসাবে যশোর জেলা দল
১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা দলের একজন অপরিহার্য সদস্য ছিলেন। তাঁর কৌশলী খেলা এবং দক্ষ পরিচালনায় জেলা দল একাধিকবার জোনাল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এই সময়ে অনেক নবীন খেলোয়াড় তাঁর খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হন।
কোচিং ক্যারিয়ার: নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা
১৯৮১ সালে দেলোয়ার হোসেন খোকন যশোর আর্মি ৫৫ ডিপ টিমের হকি দলকে প্রশিক্ষণ দেন। ওই বছরই তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর কোচ হিসাবে দায়িত্ব নেন এবং তাঁর কোচিংয়ে দল বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় গড়ে ওঠে, যারা পরবর্তীতে দেশের হকিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
ক্রীড়া সংগঠক ও প্রশাসক হিসাবে অবদান
দেলোয়ার হোসেন খোকনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো তিনি একজন দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক। ১৯৮১ সালে তিনি ‘যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা’র সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১-১৯৮২ সালে তিনি হকি পরিষদের সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং একই সময়ে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় যুক্ততা
দেলোয়ার হোসেন খোকন ক্রীড়া সাংবাদিকতাতেও বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। ক্রীড়া লেখক জীবন বোসের প্রেরণায় তিনি ‘দৈনিক ঠিকানা’ পত্রিকায় নিয়মিত ক্রীড়া বিষয়ক নিবন্ধ, তথ্য ও সংবাদ প্রকাশ করতেন। তাঁর লেখাগুলো হকির নানা দিক নিয়ে বিশ্লেষণমূলক তথ্য সংবলিত হতো, যা পাঠকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হতো।
রাজনৈতিক অঙ্গনে পথচলা
ছাত্রজীবনে দেলোয়ার হোসেন খোকন জাসদ ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি জাসদ ত্যাগ করে ১৯৯৪ সালে জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক হন। তিনি যশোর নগর বিএনপি’র আহবায়ক, যশোর জেলা চার দলীয় ঐক্যজোটের জেলা সমন্বয়কারী এবং খুলনা বিভাগীয় বিএনপি’র সমন্বয়কারী হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সামাজিক কর্মকাণ্ড ও ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
দেলোয়ার হোসেন খোকন কেবল খেলাধুলা ও রাজনীতিতেই নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ‘এনেক্স সোসাইটি’র সভাপতি ছিলেন ১৯৯৯ সালে। এছাড়াও তিনি বহুদিন ধরে ‘কিশোর ক্লাব’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, তিনি সমাজের নানা স্তরে গুণী নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন।
অবসরের পরও অনুপ্রেরণা
১৯৮২ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাধুলা থেকে অবসর নেন। তবে খেলার ময়দান ছেড়ে গেলেও তিনি হকিকে আলাদা করে কখনোই বিদায় জানাননি। তাঁর হাতে গড়া খেলোয়াড়রা এখনও দেশের হকির বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান রাখছেন। তাঁর কাজ ও অবদান আজও নতুন প্রজন্মকে ক্রীড়ার প্রতি অনুপ্রাণিত করে।


