যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরুপপুর গ্রাম, কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব ঐতিহাসিক সাক্ষী—মানিক হালদারের উদ্যোগে নির্মিত শিব মন্দির। উনিশ শতকের প্রথম দিকে নির্মিত এই মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং এক সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং নদী-নির্ভর জীবনের প্রতীক হয়ে আজও টিকে আছে।
উনিশ শতকের শুরুতে স্বরুপপুর গ্রামে জমিদারি করতেন মানিক হালদার, যিনি তাঁর প্রভাব ও সম্পদ দিয়ে গ্রামে নানা উন্নয়নমূলক কাজ করেন। শিব মন্দির ছিল তাঁর অন্যতম অবদান। সেই সময়ের জমিদাররা ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণে গৌরব বোধ করতেন, এবং এই মন্দিরটি ছিল তাঁদের ধর্মপ্রাণতার প্রতীক।
মন্দিরটি শুধু পূজার স্থান নয়, বরং গ্রামীণ জীবনে সামাজিক সমাবেশেরও কেন্দ্র ছিল। উৎসবের সময় আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ এসে এখানে মিলিত হতেন, যা গ্রামকে প্রাণবন্ত করত।
মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী উনিশ শতকের বাংলার চৌচালা ধাঁচে নির্মিত।প্ল্যাটফর্ম: সমতল ভূমি থেকে প্রায় এক মিটার উঁচু বর্গাকার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটি।উপকরণ: চুন-সুরকি ও ইট দিয়ে নির্মিত দেয়াল, যা দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক ক্ষয়-ক্ষতি সত্ত্বেও এখনও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।দরজা ও কার্নিশ: কাঠের ফ্রেমে ধনুকাকৃতি কার্নিশ এবং চৌচালায় টালি ইটের সূক্ষ্ম কারুকাজ স্থপতির শিল্পনৈপুণ্যের প্রমাণ বহন করে।সিঁড়ি: প্রবেশপথ পূর্বমুখী, যেখানে দুটি ধাপের সিঁড়ি রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের মন্দিরে প্রবেশ সহজ করেছে।স্থাপত্যের প্রতিটি অংশে চোখে পড়ে ঐতিহ্যের ছাপ—যা এখন বিরল হয়ে গেছে।
একসময় কপোতাক্ষ নদ ছিল এই অঞ্চলের প্রাণ। নদীর পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে এখানে এসে উত্তর-পশ্চিমমুখী হয়ে গেছে। মন্দিরটি ঠিক এই বাঁকের কাছেই অবস্থান করছে।
সেই যুগে নৌকাই ছিল প্রধান পরিবহন মাধ্যম। উৎসবের দিনগুলোয় দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা নৌকায় চড়ে এসে শিবপূজা দিতেন। নদীর ঘাটে নৌকার সারি, ঢাক-ঢোলের শব্দ, পূজার আলোকসজ্জা—সব মিলিয়ে মন্দিরপ্রাঙ্গণ পরিণত হতো এক বিশাল মেলায়।
শিবরাত্রি, দোলযাত্রা কিংবা বিশেষ পূজার দিনে এই মন্দিরে ভক্তদের সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো।ধর্মীয় আচার: ভোরবেলা ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনির সাথে পূজার সূচনা হতো।সামাজিক দিক: পূজার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রাপালা ও কীর্তনের আয়োজন হতো।বাণিজ্যিক দিক: মেলার সুযোগে দূর থেকে আসা ব্যবসায়ীরা পণ্য বিক্রি করতেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখত।এভাবে মন্দিরটি শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থান নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল।
আজ নদীতে স্রোত নেই, ঘাটে নেই নৌকার ভিড়, আর মন্দিরেও নেই আগের সেই ভক্তদের কোলাহল।নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌ-যাত্রা বন্ধ হয়েছে।পূজা-অর্চনার ধারাবাহিকতা কমে গেছে, মন্দিরের যত্নও কমে এসেছে।সময়ের সাথে সাথে মন্দিরের দেয়াল ও কারুকাজে ক্ষয়ের ছাপ পড়েছে।তবুও, এই শিব মন্দিরের প্রতিটি ইট আজও অতীতের গৌরবের কথা বলে।
মন্দিরটি এখন একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণের দাবি রাখে।প্রশাসনিক উদ্যোগ: স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটির সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।স্থানীয় জনগণের ভূমিকা: গ্রামবাসীর উদ্যোগে মন্দিরের সংস্কার ও পূজা-অর্চনা পুনরায় চালু হতে পারে।পর্যটন উন্নয়ন: মন্দিরকে কেন্দ্র করে পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগালে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
স্বরুপপুর শিব মন্দির শুধু ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য নয়, পর্যটনপ্রেমীদের জন্যও আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।নদীপাড়ের মনোরম পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করবে।নৌ-ভ্রমণ পুনরায় চালু করে ঐতিহ্যবাহী পূজা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করলে এটি এক বড় উৎসবস্থলে পরিণত হতে পারে।স্থানীয় হস্তশিল্প, গ্রামীণ খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্যটনের অংশ করা গেলে গ্রামের অর্থনীতি লাভবান হবে।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার স্বরুপপুর গ্রামের শিব মন্দির শুধু একটি পুরনো স্থাপনা নয়—এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। মানিক হালদারের স্বপ্ন, কপোতাক্ষ নদের গৌরব, গ্রামীণ জীবন ও ধর্মীয় বিশ্বাস—সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য ইতিহাসের প্রতীক।
আজ প্রয়োজন এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, সংরক্ষণ করা এবং এর চারপাশে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করা। তাহলেই স্বরুপপুর শিব মন্দির কেবল অতীতের স্মারক হয়ে নয়, ভবিষ্যতের গর্ব হয়ে উঠবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১২ আগস্ট ২০২৫


