যশোরের ক্রীড়াক্ষেত্রে মোঃ নূরুক হক খান লালু এক অমলিন চরিত্র। তাঁর জন্ম ১৯৫৩ সালে যশোরের সার্কিট হাউসপাড়ায়। গ্রামের বাড়ি যশোরের মণিরামপুর। পিতা আব্দুল বারি খান, বার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ সন্তান। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলই ছিল তাঁর নেশা, তাঁর প্রেরণা, তাঁর জীবনের পরিচয়।
শিক্ষাজীবন ও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার শুরু
ছাত্রজীবনেই ফুটবলের প্রতি লালুর ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পায়। যশোর জেলা স্কুল এবং এম এম কলেজে পড়াকালীন তিনি একাধারে শিক্ষার্থী ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আন্তঃকলেজ বোর্ড চ্যাম্পিয়নশিপ-এ যশোর জেলা স্কুল ও এম এম কলেজের হয়ে খেলেছেন এবং জয় ছিনিয়ে এনেছেন দলের জন্য।
জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল যাত্রা
১৯৭৩ সালে তিনি যশোর জেলা দলে যুক্ত হন। পরের কয়েক বছরেই ফুটবলে তাঁর দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ তাঁকে জেলা দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন—যা তাঁর ফুটবল জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্যের অন্যতম প্রমাণ।
ক্লাব পর্যায়ে লালুর উজ্জ্বল অধ্যায়
যশোর ও খুলনা অঞ্চলের ফুটবল ইতিহাসে লালুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তিনি খুলনার “মুসলিম স্পোর্টিং ক্লাব”, “ব্যাংকার্স ক্লাব”, “সোনালী জুট মিলস্” এবং পাকিস্তান আমলের “ইয়ং মুসলিম ক্লাব”-এর হয়ে খেলেছেন। তাঁর খেলার কৌশল, গতি ও গোল করার ক্ষমতা তাঁকে খুলনা লিগের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে গড়ে তোলে।
যশোর লীগে অবিস্মরণীয় অবদান
যশোর লীগের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে লালু এক কিংবদন্তি। তিনি “ইষ্টার্ণ ক্লাব”, “ডায়মণ্ড ক্লাব”, “টাউন ক্লাব”-এর হয়ে খেলেছেন এবং মোট পাঁচবার ক্যাপ্টেনশীপের দায়িত্ব পালন করেছেন। একাধিকবার “যুব একাদশ”-এর হয়ে মাঠে নেমে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছেন।
খেলার পজিশন ও দক্ষতা
লালুর খেলার পজিশন ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি ছিলেন একাধারে দক্ষ স্ট্রাইকার এবং শক্তিশালী ব্যাকের খেলোয়াড়। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দিয়ে দ্রুত গোলের সুযোগ তৈরি করা এবং ডিফেন্সে শক্ত অবস্থান—দুটোই সমানতালে করতে পারতেন তিনি।
অবসর জীবনে ফিরে দেখা
১৯৭৯ সালে মোঃ নূরুক হক খান লালু আনুষ্ঠানিকভাবে খেলোয়াড় জীবনের অবসান নেন। তবে ফুটবলের সাথে তাঁর সম্পর্ক কখনোই ছিন্ন হয়নি। মাঠ ছাড়লেও যশোরের ফুটবলাঙ্গনে তাঁর অবদান ও স্মৃতি আজও অমলিন।
ব্যক্তিজীবনে পরিচিতি ও পেশা
শুধু ফুটবল নয়, লালুর আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন একজন সজ্জন ব্যবসায়ী। শিক্ষা জীবনে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে তিনি ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত হন। পেশাগতভাবে সৎ ও পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি এলাকাবাসীর কাছে ছিলেন অত্যন্ত সমাদৃত।
যশোরের ক্রীড়াঙ্গনে লালুর প্রভাব
যশোরের অনেক ক্লাবে তাঁর খেলা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা। আজও বহু তরুণ খেলোয়াড় তাঁর খেলার গল্প শুনে ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহী হয়। জেলা লিগ, আন্তঃকলেজ ফুটবল, খুলনা লীগ—সবখানেই তাঁর প্রভাব ছিল সুদৃঢ়।
ফুটবলে নেতৃত্ব ও শিক্ষা
লালু কেবল খেলোয়াড় ছিলেন না, ছিলেন এক অসাধারণ নেতা। পাঁচবার ক্যাপ্টেনশীপের অভিজ্ঞতা তাঁকে নেতৃত্বের গুণে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর নেতৃত্বে দল যেমন একজোট হয়ে খেলেছে, তেমনি তাঁর খেলার নানান কৌশল আজও প্রশিক্ষকরা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
ফুটবল ও সমাজে লালুর শিক্ষা
খেলাধুলার মধ্য দিয়ে সমাজের যুবকদের সঠিক পথে পরিচালনা করা—এ বিশ্বাসেই লালু ছিলেন অটল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ফুটবল যুব সমাজকে শৃঙ্খলা, নিয়মিত অনুশীলন ও দলগত চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।
লালুর অবদান স্মরণীয় থাকবে
আজকের প্রজন্মকে যদি ফুটবলের সোনালী অতীতের গল্প শোনাতে হয়, তবে মোঃ নূরুক হক খান লালুর নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। তাঁর খেলার কৌশল, ক্লাব বদলের ইতিহাস, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে অবদান—সবকিছুই ইতিহাস হয়ে থাকবে যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে।


