বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে যাদের অবদান শুধু খেলাধুলার মাঠেই নয়, বরং পুরো ক্রীড়া সংস্কৃতিতেই অম্লান হয়ে আছে। মোঃ শফিকুল ইসলাম লিটু এমনই এক কিংবদন্তি, যিনি একই সঙ্গে হকি ও ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অবিস্মরণীয় ছাপ রেখেছেন।
১৯৬৩ সালে যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন লিটু। তিনি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন যেখানে খেলাধুলা ছিল রক্তে মিশে থাকা একটি ঐতিহ্য। পিতা শরীফুল ইসলাম বুলবুল একজন দক্ষ ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন এবং পিতামহ এডভোকেট নাজের আলী ছিলেন সম্মানিত আইনজীবী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে লিটু ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান।
লিটুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় যশোর জেলা স্কুলে, যেখানে তিনি অল্প বয়সেই খেলাধুলার প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন, যা প্রমাণ করে যে ক্রীড়া জীবনের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন।
স্কুল জীবনে ফুটবলের আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতা এবং হকির জাতীয় আন্তঃস্কুল রানার্স আপ দলে অংশগ্রহণ তাঁর প্রতিভার প্রাথমিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত লিটু যশোর ফুটবল লীগে “রেলগেট যুব সংঘ” ও “আসাদ স্মৃতি সংঘ”-এর হয়ে খেলেছেন। তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার যদিও সীমিত সময়ের, কিন্তু মাঠে তাঁর পারফরম্যান্স এবং কৌশল দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।
ঢাকা সিনিয়র ডিভিশন হকি লীগে সাফল্য : ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত লিটু ঢাকা সিনিয়র ডিভিশন হকি লীগে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর ক্যারিয়ারের শুরু হয় ১৯৮১ সালে “ওয়ারী ক্লাব”-এর হয়ে খেলার মাধ্যমে। এরপর তিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত “সোনালী ব্যাংক”-এর হয়ে খেলেন।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত লিটু ছিলেন ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের প্রধান খেলোয়াড় এবং ১৯৯৫ সালে তিনি দলের অধিনায়কত্ব করেন। তাঁর নেতৃত্বে দলটি বহুবার চ্যাম্পিয়ন হয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ: ১৯৮০-১৯৮২: যুব ও সিনিয়র বিভাগে যশোর জেলা দলের হয়ে জাতীয় হকিতে অংশগ্রহণ।১৯৯০-১৯৯৫: যশোর জেলা দলে পুনরায় খেলে অসংখ্য সাফল্য অর্জন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে জাতীয় হকিতে রানার্স আপ।তিনবার লীগ চ্যাম্পিয়ন, যখন তিনি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে খেলছিলেন।১৯৮৩-১৯৮৮: আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় হকিতে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ।
লিটু শুধুমাত্র একজন খেলোয়াড়ই নন, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন।১৯৯৮-২০০২: মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হকি কমিটির সদস্য।২০০০: ক্লাবের ম্যানেজার।২০০১-২০০২: লীগ প্রতিনিধি।বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের ঢাকা লীগ কমিটি, কেজি কমিটি, প্লানিং ও ডেভেলপমেন্ট কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন।
- ১৯৯৮: ঢাকা ক্যান্টনিয়ন এস সি-কে দ্বিতীয় বিভাগ লীগ চ্যাম্পিয়ন করান।১৯৯৮-২০০২: মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সহকারী কোচ।২০০১: অনুর্ধ্ব-১৮ জাতীয় হকি দলের সহকারী কোচ।
লিটুর জীবনী প্রমাণ করে যে খেলাধুলায় সাফল্য শুধু মাঠে নয়, বরং মাঠের বাইরেও অর্জিত হয়। তিনি খেলোয়াড়, অধিনায়ক, সংগঠক ও কোচ—সব ভূমিকায় সফল ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে অনেক তরুণ খেলোয়াড় অনুপ্রাণিত হয়েছে, যা দেশের হকি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মোঃ শফিকুল ইসলাম লিটুর ক্রীড়া জীবন এক অনুপ্রেরণার গল্প, যেখানে অধ্যবসায়, প্রতিভা ও নেতৃত্ব মিলেমিশে এক ইতিহাস গড়েছে। হকি ও ফুটবল উভয়ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১৩ আগস্ট ২০২৫


