যশোর শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু নাম। তবে কিছু নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেয়। তেমনই এক কিংবদন্তি নাম ছিল “মধু সুইটস”—যশোরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান, যা শুধু মিষ্টি বিক্রি করত না, গড়ে তুলেছিল সম্পর্ক, স্মৃতি এবং শহরের সামাজিক বন্ধন।
আজ হয়তো দোকানটির অস্তিত্ব নেই, কিন্তু যশোরের পুরনো দিনের মানুষদের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত হয়ে আছে সেই কাচের শোকেস, সারি সারি সন্দেশ আর সদ্য বানানো কাঁচা গোল্লার মাদকতাময় গন্ধ।
এক সময় যশোর শহরের ব্যস্ততম চৌরাস্তা মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকত “মধু সুইটস”। এটি ছিল শুধু একটি মিষ্টির দোকান নয়, বরং শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড়ে মুখর থাকত দোকানটি। উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা হঠাৎ অতিথি আপ্যায়ন—সব কিছুর জন্য প্রথম পছন্দ ছিল এই দোকান।
দোকানের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্বাধিকারী ছিলেন মধুসূদন সাহা—একজন অমায়িক, অতিথিপরায়ণ ও সৃজনশীল উদ্যোক্তা। তিনি নিজের হাতে তৈরি করতেন বিখ্যাত সন্দেশ ও কাঁচা গোল্লা। তাঁর আন্তরিক ব্যবহার ও পণ্যের মান দোকানটিকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
যশোরের মিষ্টির দোকানের মধ্যে “মধু সুইটস” আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল মূলত তার স্বাদ ও গুণগত মানের জন্য। বিশেষ করে তাদের সন্দেশ ও কাঁচা গোল্লা ছিল অতুলনীয়।
খাঁটি দুধ ও বিশুদ্ধ উপকরণ ব্যবহার
প্রতিদিন টাটকা প্রস্তুতকরণ
স্বাদে অনন্যতা ও পরিমিত মিষ্টতা
ঐতিহ্যবাহী রেসিপি ও দক্ষ কারিগরি
অনেকে বলতেন, যশোরে বসবাস করেছেন অথচ “মধু সুইটস”-এর মিষ্টি খাননি—এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। শহরের প্রতিটি বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন কিংবা ঈদ-পূজা—সব আয়োজনেই থাকত এই দোকানের মিষ্টির বিশেষ কদর।
“মধু সুইটস” শুধু খাবারের জায়গা ছিল না; এটি ছিল এক প্রাণবন্ত আড্ডাখানা। রাজনৈতিক নেতা বিমল রায় চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, খালেদুর রহমান টিটোসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি নিয়মিত এখানে সময় কাটাতেন।
চায়ের কাপে চুমুক আর সামনে সাজানো মিষ্টির প্লেট—এই পরিবেশে চলত রাজনীতি, সাহিত্য, সমাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জমে থাকত আড্ডা। নতুন ধারণা, মতবিনিময় আর বন্ধুত্বের উষ্ণতায় মুখর থাকত দোকানটি।
আজকের দিনে যখন সামাজিক যোগাযোগ ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ, তখন সেই সময়ের এই সরাসরি মানবিক সম্পর্ক সত্যিই অনন্য ছিল।
“মধু সুইটস”-এর খ্যাতি শুধু যশোরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সুস্বাদু মিষ্টির কথা ছড়িয়ে পড়েছিল দূরদূরান্তে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য, যিনি যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশনে পড়াশোনা করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে মধুসূদন সাহার ছিল গভীর বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্বের টানেই তিনি মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য যশোর থেকে বিশেষভাবে “মধু সুইটস”-এর মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই বিয়ের আসরে উপস্থিত ছিলেন অন্নদা শঙ্কর রায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, রবি ঘোষসহ আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
তাঁদের প্রশংসায় ভরে উঠেছিল মধু সুইটসের নাম। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, একটি ছোট শহরের মিষ্টির দোকানও তার গুণগত মান দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে পারে।
মধুসূদন সাহা শুধু একজন ব্যবসায়ী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ। ক্রেতাদের সঙ্গে তাঁর আচরণ ছিল আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস ও সম্পর্ক।
তাঁর দোকানে গেলে শুধু মিষ্টি নয়, পাওয়া যেত একরাশ ভালোবাসা। অনেকেই শুধু তাঁর সঙ্গে গল্প করতে দোকানে যেতেন। তাঁর হাসিমুখ ও অতিথিপরায়ণতা দোকানটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আজকের দিনে কর্পোরেট সংস্কৃতির ভিড়ে এমন মানবিক ব্যবসায়ীর অভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলে যায়। আধুনিকতা, প্রতিযোগিতা এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রার চাপে একসময় বন্ধ হয়ে যায় “মধু সুইটস”। ব্যস্ততা থেমে যায়, নিভে যায় আড্ডার আলো।
আজ সেই জায়গায় হয়তো অন্য কোনো ব্যবসা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু পুরনো দিনের মানুষদের মনে এখনো জেগে ওঠে সেই স্মৃতি। কাচের আলমারিতে সাজানো রঙিন মিষ্টি, ভোরবেলা দুধের গন্ধ, সন্ধ্যায় আড্ডার কোলাহল—সব মিলিয়ে এক অমূল্য সময়।
“মধু সুইটস” আজ আর বাস্তবে নেই, কিন্তু এটি যশোরের ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। একটি শহরের পরিচয় গড়ে ওঠে তার মানুষ, সংস্কৃতি ও স্মৃতির মাধ্যমে। এই দোকান সেই পরিচয়েরই অংশ ছিল।
যশোরের প্রবীণরা এখনো গল্প করেন সেই দিনের কথা। তাঁদের চোখে ভেসে ওঠে মিষ্টির স্বাদ আর মানুষের আন্তরিকতার ছবি। নতুন প্রজন্ম হয়তো দোকানটি দেখেনি, কিন্তু গল্প শুনে তারা অনুভব করতে পারে সেই সময়ের উষ্ণতা।
“মধু সুইটস” ছিল শুধু একটি মিষ্টির দোকান নয়; এটি ছিল একটি আবেগ, একটি ঐতিহ্য এবং একটি শহরের সোনালি অতীতের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোকানটি হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার স্বাদ, গল্প এবং স্মৃতি এখনো জীবন্ত।
যশোরের ইতিহাসে যখনই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান বা সাংস্কৃতিক আড্ডার কথা উঠবে, তখনই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে “মধু সুইটস”-এর নাম।
একটি শহর বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, দোকান বন্ধ হয়ে যায়—কিন্তু সত্যিকারের স্বাদ ও ভালোবাসা কখনো হারায় না।
“মধু সুইটস” আজ নেই, কিন্তু তার মধুর স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকবে যশোরবাসীর হৃদয়ে।
লেখক: সাজেদ বকুল, সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক।



