বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতে অনেক তারকা জন্ম নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মনিরুজ্জামান মিন্টু শুধু একজন খেলোয়াড় নন, বরং একজন দক্ষ প্রশিক্ষক, সংগঠক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমানভাবে পরিচিত। স্কুল জীবন থেকেই ফুটবল, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবল ও ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় যুক্ত হয়ে তিনি যশোর জেলার ক্রীড়াক্ষেত্রে এক অমর ছাপ রেখে গেছেন।
মনিরুজ্জামান মিন্টুর জন্ম ১৯৬২ সালের ৮ আগস্ট যশোর শহরের হাজী আব্দুল করিম লেনের চুড়িপট্টিতে। তাঁর পিতার নাম আব্দুস সাত্তার। শৈশব থেকেই খেলাধুলায় অদম্য আগ্রহী মিন্টু উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় তাঁর অসাধারণ প্রতিভা শৈশবেই সকলকে চমকিত করেছিল।
ফুটবল ছিল মিন্টুর অন্যতম প্রিয় খেলা। তিনি যশোরের বিখ্যাত ‘ডায়মন্ড ক্লাব’-এ অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজিত বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। মাঠে তাঁর দক্ষতা এবং খেলার প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে দ্রুত ফুটবলপ্রেমীদের নজরে নিয়ে আসে।
যশোর সম্মিলনী স্কুলে পড়াশোনার সময়েই মিন্টু বাস্কেটবলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি জেলা দলের নিয়মিত খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন এবং বহুবার যশোর জেলা দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ স্কোরিং ক্ষমতার জন্য একাধিকবার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি, যশোর জেলা শাখা তাঁকে বাস্কেটবলে বর্ষসেরা খেলোয়াড় হিসেবে সম্মানিত করে। শুধু তাই নয়, তিনি ঢাকার বিভিন্ন বড় লীগে যেমন ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, ব্যাকস্ট্রোক ক্লাব ও ফাইভ স্টার ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। খুলনা, কুষ্টিয়া, বরিশাল থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন টুর্নামেন্টে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়।
১৯৮৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ হ্যান্ডবল দলের বিপক্ষে যশোর জেলা দলের হয়ে খেলেন মিন্টু। শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, তিনি পরবর্তীতে হ্যান্ডবল প্রশিক্ষক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। যশোর, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হ্যান্ডবলের প্রশিক্ষক ও রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
২০০০ সালে যশোরে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৪ বালক-বালিকা হ্যান্ডবল বিভাগের মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তিনি জাতীয় প্রশিক্ষকের সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মিন্টু শুধু বাস্কেটবল ও হ্যান্ডবলের খেলোয়াড় নন, ব্যাডমিন্টনেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯০-৯১ সালে যশোরে নিজের সংগঠন “রেইনবো ক্রীড়া সংস্থা”-এর উদ্যোগে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন তিনি। সেখানে কুষ্টিয়া, খুলনা, পাবনা, সাতক্ষীরা, মাগুরা, কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার নামকরা ক্লাব অংশ নেয়। এ আয়োজন যশোরের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করে।যশোর সেনাবাহিনী দল, সম্মিলনী স্কুল দল, যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা, খুলনা আবাহনী, রেইনবো ক্রীড়া সংস্থা, যশোর জেলা দল (পুরুষ ও মহিলা), যশোর ও খুলনা বিডিআর দল, চুয়াডাঙ্গা বালক দল, যশোর পুলিশ লাইন স্কুল, যশোর সরকারী বালিকা বিদ্যালয়, ইসলামিয়া গার্লস স্কুল, ঝিকরগাছা পাইলট গার্লস স্কুল, মাহমুদুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
তিনি জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের একাধিক লীগ ও টুর্নামেন্টে রেফারির দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিডিআর এবং আন্তঃস্কুল ও আন্তঃকলেজ বাস্কেটবল-হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়।
মিন্টু শুধু খেলোয়াড় বা স্থানীয় প্রশিক্ষক নন, বরং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছেন।১৯৮৯ সালে এশিয়ান বাস্কেটবল কনফেডারেশন কর্তৃক ফিবা (FIBA) অনুমোদিত কোর্স। ১৯৯৭ সালে অলিম্পিক সলিডারিটি কোর্স। বাংলাদেশ অ্যামেচার বাস্কেটবল ফেডারেশনের আয়োজিত রেফারি ও প্রশিক্ষণ কোর্স। ১৯৯১ সালে বিকেএসপি হ্যান্ডবল প্রশিক্ষক কোর্স। ১৯৯৩ সালে হ্যান্ডবল রেফারি রিফ্রেসার্স কোর্স। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ হ্যান্ডবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশন কোর্স। ১৯৯৯ সালে Athletes in Action (USA) এর আয়োজিত আন্তর্জাতিক কোর্স। ২০০০ সালে স্পোর্টস মেডিসিন ও ডোপ টেস্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
মনিরুজ্জামান মিন্টু শুধু খেলোয়াড় বা প্রশিক্ষকই নন, একজন সফল ক্রীড়া সংগঠকও। তিনি বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক: রেইনবো ক্রীড়া সংস্থা, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি: এপেক্স বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন ক্লাব, প্রতিষ্ঠাতা: যশোর হ্যান্ডবল কোচিং সেন্টার, সম্পাদক: যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার বাস্কেটবল পরিষদ ও সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ হ্যান্ডবল রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের যশোর জেলা শাখা।
মনিরুজ্জামান মিন্টুর জীবনযাত্রা প্রমাণ করে যে খেলাধুলা কেবলমাত্র বিনোদন নয়, এটি সমাজ গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি মাঠে একজন খেলোয়াড়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একজন গুরু এবং সংগঠক হিসেবে এক অদম্য পথপ্রদর্শক। যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অবদান অমলিন হয়ে থাকবে।
👉 তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


