যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্ধিপাশা গ্রামে অবস্থিত মিয়াবাড়ি মসজিদ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যকীর্তির এক অনন্য উদাহরণ। মুসলিম স্থাপত্যরীতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম এই মসজিদটি নির্মিত হয় ১২৯১ বঙ্গাব্দে। এর সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিকতা ও স্থাপত্যশৈলী দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
মিয়াবাড়ি মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুন্সি ফররখ হোসেন। তিনি কালের সেরা কারিগরদের নিপুণ শিল্পকলা এবং ব্যয়বহুল উপকরণ ব্যবহার করে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ৪২ বাই ৩০ ফুট আয়তনের এই স্থাপনাটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং এক অনন্য স্থাপত্য সম্পদ।
মিয়াবাড়ি মসজিদের গঠনশৈলীতে রয়েছে শিল্প ও ঐতিহ্যের সমন্বয়।তিনটি বিশাল গম্বুজ, চারটি বড় মিনার, আটটি ছোট মিনার
প্রতিটি মিনারের শীর্ষে রয়েছে পিতল-খচিত কলসী যা এর শোভা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
মেঝেতে বিছানো হয়েছে ঝকঝকে শ্বেতপাথর, আর দেয়ালের বাহারি রঙ ও অলংকরণ পুরো পরিবেশকে রাজকীয় আবহ দেয়।
মসজিদের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো এর পলেস্টার। কথিত আছে, বিশেষ কৌশলে ইরান ও কলকাতা থেকে প্রকৌশলী এনে প্রায় ৮ লক্ষ আশি হাজার মুরগির ডিম ব্যবহার করে এই পলেস্টার তৈরি করা হয়। ডিমের সাদা অংশসহ মূল্যবান উপাদানের মিশ্রণে তৈরি হওয়ায় এর মসৃণতা এমন যে পিঁপড়েও তাতে উঠতে পারে না।
১৪০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আজও দেয়ালগুলো ধবধবে ও চকচকে অবস্থায় টিকে আছে, যা দর্শনার্থীদের বিস্মিত করে তোলে।
মিয়াবাড়ি মসজিদের প্রধান ফটকও সমানভাবে দৃষ্টিনন্দন। ভারী লোহার তৈরি এই দরজা মসজিদের ঐতিহ্য ও গাম্ভীর্যের প্রতীক। ফটক স্পর্শ করলেই নির্মাণে ব্যবহার করা সূক্ষ্ম কারিগরি ও যত্নশীলতা অনুভব করা যায়।
মিয়াবাড়ি মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং এটি মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অমূল্য রত্ন। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থী এখানে আসেন ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে এবং পবিত্রতার আবেশে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে।
অভয়নগরের মানুষের কাছে মিয়াবাড়ি মসজিদ গর্বের প্রতীক। এর ঐতিহ্য শুধু স্থানীয় জনগণের কাছে নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ। দূরদূরান্ত থেকে আগত ভ্রমণকারীরা এই মসজিদ দেখে বিমুগ্ধ হন এবং ইতিহাসের গৌরবকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেন।
মিয়াবাড়ি মসজিদ কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি অভয়নগরের ইতিহাস, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এর সৌন্দর্য, পলেস্টারের বিস্ময় এবং নিখুঁত নির্মাণশৈলী প্রমাণ করে আমাদের ঐতিহ্যের মহিমা। আজও এটি স্থানীয়দের জন্য গর্বের প্রতীক এবং পর্যটকদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ।
👉 অভয়নগরে ভ্রমণে গেলে মিয়াবাড়ি মসজিদ অবশ্যই দর্শনীয় স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য।


