বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে মহসিন আলী এমন একটি নাম যা ফুটবল ও ভলিবল উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে সমৃদ্ধ ইতিহাস রেখে গেছেন। তাঁর জীবন কাহিনী শুধু একজন ক্রীড়াবিদের সাফল্যগাঁথা নয়, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠকের দৃষ্টান্তও বটে।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাজীবন
১৯৩৫ সালে যশোর সদরের বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মহসিন আলী। তাঁর পিতা ছিলেন মোঃ মোবারেক আলী। ছয় ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে দীর্ঘদিন যশোর পৌরসভার পরিদর্শক পদে কর্মরত থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ফুটবল জীবনের সূচনা
মহসিন আলীর ফুটবল জীবনের শুরু ১৯৫২ সালে। তিনি প্রথম খেলেন ওয়াইএমসি দলে, যেখানে তখন ফুটবল নক-আউট পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হতো। সেই মৌসুমেই তাঁর দল লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়। মাঠে তিনি ব্যাক পজিশনে খেলতেন, যা দলের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে দুর্ভাগ্যবশত আঘাতজনিত সমস্যার কারণে তাঁকে ফুটবল খেলা ছাড়তে হয়।
ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে উত্থান
ফুটবল থেকে সরে এসে মহসিন আলী মনোনিবেশ করেন ভলিবল খেলায়। ১৯৫০ সালের দিকে যশোর ফায়ার সার্ভিসে ভলিবল খেলার প্রচলন ছিল, যেখানে ষ্টেশন অফিসার আদম আলীসহ খলিলুর রহমান, নূর ইসলাম, আকসেদ আলী প্রমুখ খেলোয়াড় ছিলেন।
শীতকালে টাউন ক্লাবে ভলিবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে আলমগীর সিদ্দিকী, আবুল কাসেম, মনা বোস, খোকন মিত্র প্রমুখ খেলোয়াড় অংশ নিতেন। মহসিন আলী ধীরে ধীরে ভলিবলে নিজের প্রতিভা প্রমাণ করতে থাকেন।
যশোর ভলিবল পরিষদ গঠন ও প্রাথমিক সংগ্রাম
১৯৫৯ সালে জেডিএস কমিটি ভলিবল পরিষদ গঠন করে, যেখানে সম্পাদক ছিলেন গণেশ চন্দ্র দে। এই সময় মহসিন আলী, শফিউর রহমান কালু, আলী আকবর, আবু সাঈদ, মনিরুজ্জামান মনি, আতাউল্লাহ শেখ প্রমুখ খেলোয়াড় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।
যশোর ফায়ার ব্রিগেড এবং টাউন হল ময়দানে নিয়মিত প্র্যাকটিস চললেও, রোটেশন সিস্টেমের অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে দলীয় সাফল্য আসতে দেরি হয়। পরবর্তীতে মহসিন আলী এবং তাঁর সহকর্মীরা ভলিবল নিয়ম-কানুনের বই সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করেন।
বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ভলিবল প্রতিযোগিতা
১৯৬১ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম ভলিবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে যশোর জেলা দল অংশগ্রহণ করে। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু হয় বিভাগীয় প্রতিযোগিতা। যশোর ভলিবল দল নিয়মিতভাবে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করতে থাকে এবং কয়েকবার চ্যাম্পিয়ন হয়।
জিয়াউর রহমানের আমলে তারা বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৭৫ সালে সিলেটে অনুষ্ঠিত জাতীয় খেলায় যশোর দল অংশগ্রহণ করে। সে সময়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আমির আলী, আনোয়ার, নাভারণের দিলীপ, ঝিকরগাছার তাজ, কলিম, নজরুল ইসলাম সোনা, ইব্রাহিম প্রমুখ। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত যশোর দল ধারাবাহিকভাবে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়।
প্রশাসনিক ভূমিকা ও নেতৃত্ব
মহসিন আলী শুধু খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং একজন দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও পরিচিতি পান। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভলিবল পরিষদের সম্পাদক এবং টিম ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে যশোর ভলিবল দল সংগঠিত ও পেশাদারভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিত।
১৯৮১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ভলিবল ফেডারেশন আয়োজিত কোচিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যা তাঁর ক্রীড়া জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
যশোরের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে অবদান
মহসিন আলীর অবদান শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি যশোরের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টা এবং নেতৃত্বে যশোরে ভলিবল খেলা একটি জনপ্রিয় ও নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রমে পরিণত হয়।
তাঁর সময়ে যশোরের ক্রীড়া অঙ্গন শুধুমাত্র স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি লাভ করে। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও নেতৃত্ব যশোরের তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে।
মহসিন আলীর উত্তরাধিকার
মহসিন আলীর জীবন কাহিনী আমাদের শেখায় যে, খেলাধুলার প্রতি অদম্য ভালোবাসা ও নিবেদন একজন মানুষকে কীভাবে ইতিহাসে স্থান করে দিতে পারে। তিনি ছিলেন এমন এক ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক, যিনি নিজের যোগ্যতা, নেতৃত্ব এবং অনুপ্রেরণার মাধ্যমে যশোরের ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
আজও যশোরের অনেক খেলোয়াড় এবং ক্রীড়াপ্রেমীরা তাঁর অবদান স্মরণ করেন এবং তাঁকে অনুসরণ করেন।
উপসংহার:
মহসিন আলীর ফুটবল ও ভলিবল জীবনের সাফল্য, তাঁর নেতৃত্বগুণ এবং যশোরের ক্রীড়াঙ্গনে অবদান তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর জীবন ক্রীড়াপ্রেমী এবং সংগঠকদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৫


