যশোরের প্রাণ — মুক্তেশ্বরী নদীর অতীত ঐতিহ্য
যশোরের হৃদয় ভেদ করে প্রবাহিত মুক্তেশ্বরী নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি একসময় ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। প্রাচীন কালে এই নদীর স্বচ্ছ ও স্বচ্ছন্দ স্রোতধারা গ্রামের মানুষের জীবনে এনেছিল সমৃদ্ধি, শান্তি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ ছোঁয়া। গ্রীষ্মের দুপুরে পাড়ে বসে শিশুদের হাসি-খেলা, নদীর ঢেউয়ের সুরে ভেসে আসা পাখির গান, আর কৃষক-জেলেদের নৌকা বেয়ে ফেরা ছিল এই অঞ্চলের নিত্যদিনের চিত্র।
অতীত থেকে বর্তমান — ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া নদীর প্রবাহ
এক সময়ের প্রবল স্রোত আর মাছের প্রাচুর্যে ভরা এই নদী আজ দখলদারিত্ব ও অবহেলার শিকার। যশোর সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের পুলেরহাট থেকে চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর বাঁওড় ও সলুয়া বাজার পর্যন্ত মুক্তেশ্বরীর স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দুই তীরে গড়ে উঠেছে অবৈধ বহুতল ভবন, নদীর বুকে ছড়িয়ে আছে আবর্জনার স্তুপ, এবং মাছ চাষের জন্য নেটপাটা ও বাঁশের বেড়া দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে নদীর মুক্ত স্রোত।
দখলদারিত্বের ভয়াবহ চিত্র
স্থানীয়দের মতে, নদীর প্রকৃত সীমানা আজ প্রায় অদৃশ্য। কোথায় কত জমি দখল হয়েছে, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। দখলদাররা নদীর বুক চিরে ব্যক্তিগত ব্যবসা চালাচ্ছে, অথচ নদী সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ চোখ বন্ধ করে আছে।
স্থানীয়দের স্মৃতিচারণ — এক নদীর ধ্বংসগাথা
পুলেরহাটের এক প্রবীণ চা দোকানদার বলেন — “একসময় নদীর জল ছিল কристালের মতো স্বচ্ছ, মাছ ধরা ছিল আনন্দের, আর নদীর বাতাসে ছিল শীতল প্রশান্তি। এখন এই নদী মরা খালে পরিণত হয়েছে।”
অন্যদিকে আরবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, মাছ চাষের নামে অবৈধ নেটপাটা বসিয়ে নদীর পানি প্রবাহ রোধ করা হচ্ছে। ফলে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, সাধারণ মানুষ নদীতে নামলে প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে পড়ছে।
নদী ধ্বংসের বহুমুখী প্রভাব
১. পরিবেশগত ক্ষতি
প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় নদীর জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হচ্ছে। বহু প্রজাতির দেশি মাছ আর দেখা যায় না, জলজ উদ্ভিদও কমে গেছে।
২. কৃষি উৎপাদনে হুমকি
নদীর পানি ছিল স্থানীয় কৃষকদের সেচের প্রধান উৎস। এখন সেই পানি না পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ফসলের ফলন কমছে।
৩. মানুষের জীবনযাত্রার অবনতি
নদীর উপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষ এখন বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটে পড়েছে। যারা একসময় নদী থেকে জীবিকা নির্বাহ করত, এখন তারা অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছে।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই — প্রশাসনিক ব্যর্থতা
বাংলাদেশে নদী সংরক্ষণ আইন থাকলেও মুক্তেশ্বরী নদীর ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ প্রায় শূন্য। স্থানীয় সংগঠন ‘জনউদ্যোগ যশোর’ দীর্ঘদিন ধরে নদী রক্ষার আন্দোলন চালালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো গ্রহণ করা হয়নি। বরং দখলদারিত্বের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।
আশার আলো — পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মুক্তেশ্বরী নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার খর্নিয়া পর্যন্ত খনন ও দখলমুক্ত করার প্রকল্প ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে নদী পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে।
আমাদের করণীয় — নদী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন
মুক্তেশ্বরী নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।
- অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে।
- নদীর তীরে বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।
- নদীর পানি দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
- স্থানীয় জনগণকে নদী সংরক্ষণের সাথে যুক্ত করতে হবে।
নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে
মুক্তেশ্বরী নদী একসময় যেমন মানুষের মুক্তির প্রতীক ছিল, তেমনই আবারো হতে পারে। প্রকৃতি ও নদীর সাথে সহাবস্থানের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করি, দখলমুক্ত, স্বচ্ছ, জীবন্ত মুক্তেশ্বরী নদী শুধু যশোর নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনীতিকে নতুন প্রাণ দেবে।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৫


