ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদীর তীর জুড়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস বাংলার আদি ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। এই নদীগুলোর তীরে একসময় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য সমৃদ্ধ পল্লী ও নগর, যেখানে জ্ঞান, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র অঞ্চলে। সেই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মুরলী নগর—যা আজ মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলেও, রেখে গেছে ধ্বংসস্তূপ ও নীরব ইতিহাসের সাক্ষ্য।
লাট দ্বীপ থেকে লাটুয়া পরগণা – মুরলীর রাজনৈতিক বিকাশ
প্রাচীনকালে মুরলী নগর ছিল লাট দ্বীপের অংশ, যা পরে লাটুয়া পরগণা নামে পরিচিতি লাভ করে। আর্যদের বিস্তার ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সাথে সাথে এই অঞ্চল হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বৈদিক যুগে বঙ্গদেশে অনার্যদের বসতি বিদ্যমান ছিল, কিন্তু বলির পুত্রগণ অঙ্গ-বঙ্গ অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করার পর থেকে আর্যরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তারা এখানে তীর্থক্ষেত্র ও পীঠমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করে।
মহাভারতের যুগে মুরলীর গুরুত্ব
ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, মহাভারতের যুগে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ভীমসেনকে পূর্বদেশ জয় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় বঙ্গদেশ তিন ভাগে বিভক্ত ছিল—
- পূর্ববঙ্গ
- পশ্চিমবঙ্গ
- দক্ষিণ বঙ্গ
উপবঙ্গ ছিল পশ্চিমবঙ্গের অধীন, এবং মুরলী ছিল এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর। ধারণা করা হয়, উপবঙ্গের শাসক ছিলেন চন্দ্রসেন। দক্ষিণ বঙ্গ বা রাঢ়ের রাজধানী তাম্রলিপ্ত ম্লেচ্ছ জাতির আবাসস্থল হিসেবে উল্লেখিত হলেও, উপবঙ্গে আর্য শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে মুরলী
মুরলীর ধ্বংসাবশেষে প্রাচীন দেবালয় ও মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে এখানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বিকশিত হয়েছিল মহাভারতীয় যুগ থেকেই। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, একসময় এখানে এক সন্ন্যাসীর প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দির ছিল।
- একটি বৃহদাকার বটবৃক্ষের কোটরে মন্দিরের প্রাচীরের চিহ্ন মিলেছিল।
- চাঁচড়ার রাজাদের আমলে এখানে পূজা-অর্চনার বিশেষ আয়োজন হতো।
- উদ্ধার হওয়া কালীমূর্তি ছিল হস্ত-পদবিহীন, কিন্তু তা অতীতের শৌর্য ও শিল্পকলার প্রমাণ বহন করত।
ভৌগোলিক বিস্তার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
প্রাচীন মুরলী নগরের আয়তন ছিল প্রায় চার-পাঁচ মাইল। এর বিস্তার ছিল পালপাড়া, পুরাতন কসবা, বামনপাড়া হয়ে বকচর পর্যন্ত। ভৌগোলিকভাবে এটি ছিল গাঙ্গের উপদ্বীপের একটি বৃহৎ চর, যা সময়ের সাথে মিলিত হয়ে বড় দ্বীপে পরিণত হয়। বকচর নামটিই এই ভৌগোলিক পরিবর্তনের প্রমাণ বহন করে।
মুরলী কেবল ধর্মীয় কেন্দ্রই ছিল না, বরং ছিল বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ হাব। নদীপথে পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ছিল, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল।
আর্য সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে মুরলী
বাংলার প্রাচীন নগরগুলোর মধ্যে যেমন গৌড়পুর, পুণ্ড্রনগর, তাম্রলিপ্ত, সোমপুর, বসুবিহার, বর্ধমান, পুষ্কর্ণ, চন্দ্রদ্বীপ—মুরলীও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উদ্ধার হওয়া হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি, প্রাচীন ইটের স্থাপনা এবং ভগ্নস্তূপ আজও সেই সভ্যতার সাক্ষী।
এখানে ধর্ম, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল এক সমন্বিত আর্য ঐতিহ্য, যা বহু শতাব্দী ধরে সমৃদ্ধি লাভ করে।
প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও মুরলীর বিলুপ্তি
ভৈরব ও কপোতাক্ষ নদীর ভাঙা-গড়া ও চর গঠনের প্রক্রিয়া মুরলীর ভৌগোলিক অবস্থানকে বারবার পরিবর্তিত করেছে। নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ায় এবং বন্যার ফলে ধীরে ধীরে এই জনপদ হারিয়ে যায়।
যা একসময় ছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র, তা আজ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপ ও নীরব স্মৃতিচিহ্নে।
ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
মুরলী নগরের ধ্বংসাবশেষ বাংলার প্রাচীন আর্য সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এখানে বহু প্রাচীন ইট, পাথরের মূর্তি এবং ভগ্ন প্রাচীরের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে এখানে একাধিক মন্দির, প্রশাসনিক ভবন এবং আবাসিক এলাকা ছিল।
ঐতিহাসিকরা একে আর্য সভ্যতার একটি উজ্জ্বল কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা শুধু স্থানীয় নয়, আঞ্চলিক ইতিহাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আজকের মুরলী – অতীতের ছায়া
বর্তমানে মুরলীর আসল রূপ আর দৃশ্যমান নেই। কেবল কিছু ভগ্ন প্রাচীর, মূর্তির টুকরো এবং স্থানীয় জনশ্রুতি এই নগরের গৌরবময় অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে আজও প্রচলিত আছে মুরলীর সোনালী যুগের গল্প।
উপসংহার
মুরলী নগর কেবল একটি হারানো জনপদ নয়, বরং ছিল বাংলার আর্য সভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। এখানে ধর্ম, বাণিজ্য ও সংস্কৃতি এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে এটি একসময় সমগ্র অঞ্চলের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। যদিও সময়ের প্রবাহে এর সবকিছু বিলীন হয়ে গেছে, তবু ইতিহাসে মুরলীর গুরুত্ব আজও অম্লান।
✍️ তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১০ আগস্ট ২০২৫


