যশোর সদরের নাটুয়াপাড়া এমন এক গ্রাম, যেখানে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মানুষের আন্তরিকতা মিলেমিশে এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সময়ের ধুলোমাখা ইতিহাস, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া মানবিক গল্প, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্য এখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই গ্রামে প্রবেশ করলেই অনুভূত হয় এক শান্তির আবেশ, যা শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি দিয়ে মনের গভীরে প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।
গ্রামটি সবুজ শস্যক্ষেত, সরু আঁকাবাঁকা পথ, আর গাছগাছালির ছায়ায় ঘেরা। বর্ষায় নদীর ধারে জলের কলকল ধ্বনি, শীতে শিশির ভেজা প্রভাত, আর গ্রীষ্মে খেজুরগাছের ছায়া—সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ দেখা যায় এখানে। নাটুয়াপাড়ার আকাশ সারাবছরই খোলা, পাখির কলকাকলিতে ভরে ওঠে সকাল। শীতের ভোরে খেজুরের রসের মিষ্টি গন্ধ যেন গ্রামটিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
নাটুয়াপাড়ার মানুষ তাদের আতিথেয়তা আর উষ্ণ হৃদয় দিয়ে অতিথিকে মুগ্ধ করে। গ্রামের মানুষজন একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ান, যা আজকের দিনে খুব কম জায়গায় দেখা যায়। অতিথি এলে গরম চা, খেজুরগুড়ের পায়েস কিংবা তাজা ফল দিয়ে আপ্যায়ন এখানে এক অলিখিত নিয়ম।
গ্রামের অন্যতম গর্ব বিষ্ণুপদ বিশ্বাস — বাংলাদেশের সেরা খেজুরগুড় কারিগরদের একজন। তার তৈরি খেজুরগুড় শুধু যশোরেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমান জনপ্রিয়। গাঢ় বাদামি রঙ, অনন্য স্বাদ, আর প্রাকৃতিক সুবাসে ভরা এই গুড় শীতের সকালের পিঠেপুলিতে যেন এক অপরিহার্য উপাদান। বিষ্ণুপদ বিশ্বাসের কারিগরি দক্ষতা ও নিষ্ঠা নাটুয়াপাড়ার নাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে।
নাটুয়াপাড়ায় ‘আমাদের বাড়ি’ আশ্রম শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মানবিকতার এক প্রতীক। অবহেলিত প্রবীণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এই আশ্রম আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করে।
২০২২ সালে প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ রশীদ ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে এই আশ্রম নির্মাণ করেন। প্রায় দুই একর জমির উপর গড়ে ওঠা এই আশ্রমে ১৫০ জন একসাথে থাকতে পারেন। এখানে প্রবীণরা যেমন সম্মান পান, তেমনই শিশুরা শিক্ষা ও বিনোদনের সুযোগ পায়। এই আশ্রম নাটুয়াপাড়ার মানবিক চেতনার উজ্জ্বল উদাহরণ।
‘নাটুয়া’ শব্দের অর্থ এমন এক নৃত্যশৈলী, যেখানে লাঠি, ঢাল, তলোয়ার ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক ভঙ্গি প্রদর্শন করা হয়। শক্তি ও সাহসের প্রতীক এই নৃত্য একসময় নাটুয়াপাড়ার গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ ছিল।
প্রবীণ বাসিন্দা বিষ্ণুপদ সরকার জানিয়েছেন, গ্রামের পুরনো নাম ছিল নাট্যগড়া। এখানকার মানুষ যাত্রাপালা ও নাটক মঞ্চস্থ করতেন, এবং নাটকের দল গঠন করতেন। সময়ের সাথে ‘নাট্যগড়া’ পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘নাটুয়াপাড়া’। এই ইতিহাস গ্রামের সাংস্কৃতিক শেকড়কে আরও গভীর করে।
নাটুয়াপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব, নবান্ন, ও পূজা-পার্বণ বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়। শীতের সন্ধ্যায় পাড়ায় পাড়ায় হাট বসে, যেখানে স্থানীয় হস্তশিল্প, পাটের তৈরি জিনিস, এবং গৃহনির্মিত খাবার বিক্রি হয়। ঈদ ও দুর্গাপূজায় মুসলিম-হিন্দু সবাই একসাথে আনন্দ ভাগ করে নেন—এখানে ধর্ম নয়, বরং সম্পর্কই মূল।
নাটুয়াপাড়ার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, গম, শাকসবজি চাষের পাশাপাশি খেজুরগাছের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির পেশা এখানকার একটি বিশেষ আয়ের উৎস। অনেক পরিবার খেজুরগুড় বিক্রি করে সারা দেশের বাজারে পরিচিতি পেয়েছে। এছাড়া পশুপালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাও অর্থনীতিতে অবদান রাখে।
গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং নিকটবর্তী উচ্চ বিদ্যালয় থাকায় শিক্ষার হার ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে নাটুয়াপাড়ার অনেক তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও পড়াশোনা করছেন। শিক্ষা ও প্রযুক্তির সাথে গ্রাম দ্রুত আধুনিকতার পথে এগোচ্ছে।
নাটুয়াপাড়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মানবিক কর্মকাণ্ড পর্যটনের জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহযোগিতা পেলে এই গ্রাম গ্রামীণ পর্যটনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এখানে হোমস্টে, লোকশিল্প প্রদর্শনী, এবং কৃষিভিত্তিক পর্যটনের উদ্যোগ নিলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক আকৃষ্ট হবে।
নাটুয়াপাড়া শুধু একটি গ্রাম নয়, বরং প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানবতার এক মিলনমেলা। এখানে এসে দেখা যাবে কীভাবে এক সম্প্রদায় ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্যকে জীবিত রেখেছে।
যাঁরা এখনও এই গ্রামে আসেননি, তাঁদের জন্য এটি একটি উন্মুক্ত আমন্ত্রণ—এসে দেখুন সেই মাটির গন্ধ, প্রকৃতির রঙ, আর মানুষের উষ্ণতা, যা হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।


