ভৈরব নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে এক নীরব ইতিহাস—নওয়াপাড়া কালীমন্দির। যশোর-খুলনা মহাসড়কের নওয়াপাড়া বাজারের পাশ দিয়ে যাঁরা চলাচল করেন, তাঁদের চোখে হয়তো এটি শুধু একটি সাধারণ মন্দির বলে মনে হয়। কিন্তু এই মন্দিরের অন্তরে লুকিয়ে আছে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের প্রাচীন কাহিনি, ভক্তি আর অলৌকিকতার এক অনন্য সাক্ষ্য।
১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে এক ধর্মপ্রাণ কালীভক্তা মোক্ষদা সুন্দরী দেবী কালীকে স্বপ্নে দর্শন পান। স্বপ্নে দেবী তাঁকে জানান—ভৈরবকূলের বুকে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছে, আর তাঁকে সেখানে অধিষ্ঠিত করার নির্দেশ দেন।
পরদিন ভাটার সময় মোক্ষদা সুন্দরী কয়েকজন ব্রাহ্মণ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে নদীর তীরে আসেন। জল সরে গেলে স্বপ্নে দেখা সেই স্থানেই মাটি খুঁড়তেই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। গভীর জলতল থেকে উঠে আসে এক কালীমূর্তি—যেন দেবী স্বয়ং তাঁর ভক্তের আহ্বানে উপস্থিত হয়েছেন।
মোক্ষদা সুন্দরী সেই অলৌকিক মূর্তিকে ভক্তিভরে বটবৃক্ষের ছায়াতলে প্রতিষ্ঠা করেন। সেদিন থেকেই জন্ম নেয় নওয়াপাড়া কালীমন্দির।
একসময় এই মন্দির ছিল জাগ্রত ও সিদ্ধিময়। পূজা-পার্বণে ভক্তদের ঢল নামত, ভৈরবকূল মুখরিত হয়ে উঠত শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের বাদ্যে। ভক্তদের বিশ্বাস ছিল—এখানে দেবী প্রত্যক্ষ শক্তি হিসেবে বিরাজ করেন।
কালের স্রোতে বদলেছে মন্দিরের চেহারা। আর নেই সেই প্রাচীন বটবৃক্ষ, নেই মূল স্থাপনার পুরনো রূপও। তবে ভৈরব নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা নওয়াপাড়া কালীমন্দির আজও মহাকালের এক অনড় সাক্ষী হয়ে আছে।
ভক্তরা এখনও বিশ্বাস করেন—মায়ের মহিমা অটুট রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও মোক্ষদা সুন্দরীর ভক্তি, ভৈরবকূলের পবিত্রতা আর দেবীর অলৌকিক শক্তি একইভাবে বিরাজমান।
নওয়াপাড়া কালীমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি যশোরের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও ভক্তির এক জীবন্ত প্রতীক। সাড়ে তিনশ বছরের প্রাচীন এই মন্দির আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভক্তি ও বিশ্বাসের শক্তি কতটা অনন্ত এবং অটল হতে পারে।


