যশোর শহরের অতীত ইতিহাসে কসবা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে আজও চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন দুইজন মহান সাধক—পীর বাহরাম শাহ ও গরীব শাহ। এ অঞ্চল শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক কেন্দ্রই নয়, বরং বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রাচীন প্রশাসনিক কার্যক্রমের এক অনন্য সাক্ষী।
শহর থেকে মাত্র এক মাইল পশ্চিমে, কারবালার নিকটে অবস্থিত পীর বাহরাম শাহের মাজার। অতীতে এ স্থান ছিল ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত, নির্জন ও রহস্যময়। মাজারের পূর্বদিকে রয়েছে একটি বিশাল দীঘি, যা স্বয়ং পীর বাহরাম শাহ নিজ হাতে খনন করেছিলেন।
এই দীঘি কেবল পানির উৎসই ছিল না; এটি ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। ধর্মীয় আচার, পানি সংরক্ষণ ও সামাজিক সমাবেশের কেন্দ্র হিসেবে এর ভূমিকা ছিল অসামান্য। পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, মৃত্যুর শত শত বছর পরও মানুষ এখানে মানত করে, সিন্নি দেয় এবং বিশ্বাস করে যে, তাঁর দরগাহে প্রার্থনা করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়।
যশোর ফৌজদারি আদালতের উত্তর কোণে, ভৈরব নদীর তীরে এক প্রাচীন বটগাছের ছায়াতলে গরীব শাহ শুয়ে আছেন চিরনিদ্রায়। তিনি ছিলেন দরিদ্র মানুষের আশ্রয়স্থল ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তাঁর দরগায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ আসেন মনোবাসনা পূরণের জন্য।
এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসে দোয়া করে, আর বার্ষিক উরস উপলক্ষে হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে। গরীব শাহের জীবন ছিল মানবকল্যাণ ও সহমর্মিতায় ভরপুর, যা আজও স্থানীয় লোককথা ও বিশ্বাসে জীবন্ত।
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, মুরলী–কসবায় অবস্থানকালে পীর খান জাহান আলী তাঁর অনুচরদের দুই দলে বিভক্ত করেছিলেন।একদল কপোতাক্ষ নদীর তীর ধরে যাত্রা শুরু করে, নেতৃত্বে ছিলেন বোরহান খাঁ (যিনি বুড়ো খাঁ নামেও পরিচিত) ও তাঁর পুত্র ফতে খাঁ।অপর দল ভৈরব নদীর তীর ধরে যাত্রা করেন, নেতৃত্বে স্বয়ং পীর খান জাহান আলী।
উভয় দলই যাত্রাপথে মানুষের কল্যাণে অসংখ্য কাজ সম্পন্ন করেছিলেন—মসজিদ নির্মাণ, দীঘি খনন, রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি। এই প্রাচীন স্থাপনাগুলোর নিদর্শন এখনো মুরলী–কসবায় ও তার আশপাশে বিদ্যমান।
মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের পতনের পর ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে। রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তরের পর, ১৭৭২ সালে মুরলী–কসবায় রাজস্ব আদায়ের জন্য একজন ইংরেজ কালেক্টর নিয়োগ করা হয়।
১৭৮২ সালে মোগল আমলের ফৌজদারি শাসনব্যবস্থার আদলে যশোর অঞ্চলে প্রথম জেলা দপ্তর স্থাপিত হয় মুরলী–কসবায়। এখানে নিযুক্ত হন এক ম্যাজিস্ট্রেট, এবং যে আদালত গড়ে ওঠে, তা স্থানীয়দের কাছে “মুরলীর কাছারি” নামে পরিচিত হয়।
১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রশাসনিক কারণে কাছারি স্থানান্তরিত হয় মুরলী থেকে কসবায়। এর ফলে প্রাচীন নগরীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।
যে নগর একসময় বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল, তা ধীরে ধীরে জনবিরল হয়ে পড়ে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাঠান আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হতে থাকে।
মুরলী–কসবা শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্রই ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মিলনস্থল।প্রাচীন দীঘি ও মসজিদ এখানে অতীত গৌরবের সাক্ষ্য বহন করছে।রাস্তা ও সেতুর অবশিষ্টাংশ প্রমাণ করে, এ অঞ্চল একসময় বাণিজ্য ও যাতায়াতের কেন্দ্র ছিল।স্থানীয় লোককথা, গান ও প্রবাদ এখনো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে, যা এই এলাকার মানুষের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে।
দুই মহামানবের শিক্ষা ও জীবনদর্শন মানুষের অন্তরে চিরকাল অম্লান হয়ে আছে। তাদের মূল বার্তা ছিল—মানবসেবা, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় সহনশীলতা। আজও অসংখ্য মানুষ তাঁদের মাজারে এসে শান্তি খুঁজে পান।
এই স্থানগুলো কেবল ধর্মীয় গন্তব্যই নয়, বরং বাংলার অতীত ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল, যা ঐতিহাসিক পর্যটন ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
যশোর শহরের প্রাচীন কসবা শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আজও মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত। পীর বাহরাম শাহ ও গরীব শাহের মতো আধ্যাত্মিক নেতারা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, মানবকল্যাণ ও সহমর্মিতাই প্রকৃত ধর্ম। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এই মিলনস্থল বাংলার গৌরবময় অতীতের এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে চিরকাল।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ১২ আগস্ট ২০২৫


