ধলঘাট: এক বিপ্লবের জন্মভূমি
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, যিনি বাংলার প্রথম নারী শহিদা বিপ্লবী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন, তাঁর জন্মস্থান ধলঘাট চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম হলেও আজ তা সমগ্র দেশের গর্বের অংশ। ১৯১১ সালের ৫ মে সমুরা গ্রামের এক সাধারণ গৃহে জন্মগ্রহণ করেন এই অগ্নিকন্যা। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার, মাতা প্রতিভাময়ী দেবী—দুইজনই চট্টগ্রামের শিক্ষিত, সৎ ও সংস্কৃতিমনা পরিবারের প্রতীক ছিলেন।
ছোট গ্রাম থেকে শহর: প্রীতিলতার শিক্ষা ও সংগ্রামের গল্প
ধলঘাটের শান্ত গ্রাম ছেড়ে প্রীতিলতা চট্টগ্রাম শহরে চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অদম্য মেধাবী। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর ইডেন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঐতিহ্যবাহী কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তৎকালীন সময়ে নারীশিক্ষা ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। প্রীতিলতা সেই বৃত্ত ভেঙে বাংলার নারীসমাজের জন্য একটি দিগন্ত উন্মুক্ত করেন।
বিপ্লবের মঞ্চে প্রীতিলতা: সূর্য সেনের বিশ্বস্ত সঙ্গী
১৯২৮ সাল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নতুন মোড়। বাংলার যুবসমাজ এক স্বপ্নের পিছনে ছুটছে—এক স্বাধীন মাতৃভূমি। এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে মাস্টারদা সূর্য সেন গড়ে তুলেছিলেন এক বিপ্লবী দল। প্রীতিলতা তাঁর ছত্রছায়ায় যুক্ত হন। তাঁর দায়িত্ব ছিল পুরুষ বিপ্লবীদের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করা।
ধলঘাটের সাবিত্রী দেবীর বাড়ি ছিল বিপ্লবীদের অন্যতম আস্তানা। সেখানেই প্রীতিলতা প্রথম বিপ্লবী কার্যক্রমের অংশ নেন। ধলঘাট যুদ্ধের মাধ্যমে প্রীতিলতার নাম বিপ্লবের ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে যায়।
ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ: শোষণের বিরুদ্ধে এক নারীর দাঁতভাঙা জবাব
১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ ছিল উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মাইলফলক। ক্লাবের গেটে লেখা ছিল, “Dogs and Indians not allowed”—এক নিঃশব্দ অথচ গভীর অপমান। প্রীতিলতা সেই অপমানের জবাব দিতে জীবন বাজি রাখলেন।
তিনি ১৫-১৬ জন বিপ্লবীর দল নিয়ে ক্লাব আক্রমণ করেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধরা পড়া বাঁচাতে তিনি নিজের সাথে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড পান করে আত্মাহুতি দেন। তাঁর এই আত্মোৎসর্গ যুগে যুগে নারীর সাহস ও আত্মসম্মানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
শেষ চিঠি: নারী স্বাধীনতার অঙ্গীকার
মৃত্যুর আগে প্রীতিলতা একটি চিরকুটে লিখেছিলেন—
“ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে জন্ম নয় আমার। আমি বিপ্লবী কন্যা, চট্টলকন্যা, অগ্নিকন্যা। ইংরেজের শক্তি নেই, আমাকে বন্দী করে।”
আরেকটি চিঠিতে তিনি ব্যথিত হৃদয়ে লিখেছিলেন—
“দেশের মুক্তিসংগ্রামে পুরুষ ও নারীর পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করেছিল। ভাইয়েরা যুদ্ধে নামতে পারলে, আমরা বোনেরা কেন পারব না?”
এই কথাগুলো আজও বাংলার নারীদের শিরায় শিরায় সাহস যোগায়।

ধলঘাটের স্মৃতিচিহ্ন: প্রীতিলতা কমপ্লেক্স
ধলঘাটের পবিত্র মাটিতে ‘প্রীতিলতা কমপ্লেক্স’ আজ ইতিহাসের প্রামাণ্য সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর, তৎকালীন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এর উদ্বোধন করেন। এই ছয়তলা বিশিষ্ট ভবনটি শুধু একটি কমপ্লেক্স নয়; এটি এক বিপ্লবী চেতনার প্রতীক।
কমপ্লেক্সে রয়েছে—
- প্রীতিলতা গণসাংস্কৃতিক মঞ্চ
- মাস্টারদা সূর্য সেন রিসার্চ সেন্টার
- সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার
- প্রীতিলতা শিশুকানন বিদ্যানিকেতন
- কল্পনা দত্ত যোশী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
এই প্রতিষ্ঠান আজকের প্রজন্মকে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করছে।
ধলঘাটের মানুষের স্মৃতিরক্ষা প্রচেষ্টা
স্থানীয় মানুষদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘দক্ষিণ সমুরা বিপ্লবী পূর্ণেন্দু-অর্ধেন্দু-সুখেন্দু-প্রীতিলতা স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদ’। প্রীতিলতার বসতভিটার পাশে ১৯৭০ সালে তাঁর সহযোদ্ধা পূর্ণেন্দু দস্তিদার একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেন। এটি আজও ধলঘাটের মানুষের গর্ব।
প্রীতিলতার উত্তরাধিকার: নারী জাগরণের অগ্নিবীণা
২৩ বছরের ক্ষণজন্মা এই নারী আজও আমাদের অনুপ্রেরণা। নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, আত্মসম্মান আর সমঅধিকারের কথা বললেই প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নাম আসে এক অদম্য শক্তি হয়ে। তাঁর শিকড় ধলঘাট আজও গর্বিত—এই মাটিতেই জন্মেছিল এক অগ্নিকন্যা, যিনি প্রমাণ করে গেছেন, বাঙালি নারী কখনো দুর্বল নয়।
উপসংহার
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার শুধু একটি নাম নয়, এটি এক আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগ ও বিপ্লবী চেতনা নতুন প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা। ধলঘাটের মাটি, প্রীতিলতার বসতভিটা আর প্রীতিলতা কমপ্লেক্স—সবই প্রমাণ করে এই দেশের নারীসমাজ কখনোই শৃঙ্খলিত হতে রাজি নয়।
আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাই—“ত্যাগই শ্রেষ্ঠ শক্তি।”


