রামায়ণের ইতিহাস ও রাবণের নাম জড়ানো সেই স্থানের খোঁজ
ভারতের উপমহাদেশে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে রামায়ণ ও মহাভারতের মহাকাব্যিক কাহিনি। সেই কাহিনির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র রাবণ, যার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে এক পরাক্রমশালী রাজার ছবি। রাবণ শুধু রামের প্রতিদ্বন্দ্বীই নন, ছিলেন জ্ঞান, বীরত্ব ও ঐশ্বর্যের প্রতীক। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানগুলো আজও পর্যটকদের কাছে চরম কৌতূহলের বিষয়।
সিগিরিয়া: রাবণের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ
শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত সিগিরিয়া নামক এক পর্বতশৃঙ্গ আজও বহন করে রাবণের অতীত গৌরবের চিহ্ন। প্রায় ২০০ মিটার উচ্চতার এই পাহাড়ের চূড়ায় একসময় দাঁড়িয়ে ছিল এক রাজকীয় প্রাসাদ, যা বহু মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী ছিল রাবণের আসল রাজপ্রাসাদ।
যদিও আজ সেখানে কেবল ধ্বংসাবশেষই দেখা যায়, তবুও সেই ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি ইট যেন গল্প বলে এক রাজকীয় অতীতের। গবেষকরা অনুমান করেন, প্রায় ৩ লক্ষ ইট ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছিল এই মহা প্রাসাদ, যেগুলো ওই উচ্চতায় কিভাবে তোলা হয়েছিল তা আজও এক রহস্য।
জলের বাগান: প্রাচীন জল সংরক্ষণের বিস্ময়
প্রাসাদের অন্যতম আকর্ষণ ছিল এক অত্যাধুনিক জলাধার – যা আজও সেখানে দেখা যায়। এই “জলের বাগান” নামে খ্যাত স্থানটিতে এক সময় রাজপ্রাসাদের জলসংগ্রহের ব্যবস্থা ছিল। আজকের দিনে এসেও সেখানে দাঁড়িয়ে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না—কীভাবে সেই যুগে এত উন্নত প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা ছিল?
এটি রাবণের স্থাপত্য-জ্ঞান ও দূরদর্শিতার প্রমাণস্বরূপ বিবেচনা করেন বহু ঐতিহাসিক।
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল
সিগিরিয়া পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালে চারদিক ঘিরে থাকে ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য। সেখানে দাঁড়িয়ে সহজেই বোঝা যায়, রাবণ কেন এই স্থানকে বেছে নিয়েছিলেন তার প্রাসাদের জন্য। একদিকে দুর্গতুল্য নিরাপত্তা, অন্যদিকে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য—এই স্থান যেন ছিল আদর্শ এক রাজপ্রাসাদের জন্য।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে দর্শনার্থীদের বিস্ময়
সিগিরিয়ায় পৌঁছাতে হলে আজও সিঁড়ি বেয়ে প্রায় ২০০ মিটার উপরে উঠতে হয়। কিন্তু সেই কষ্ট যে এক চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়, তা পর্যটকদের অভিজ্ঞতাই বলে দেয়। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে ইতিহাসের নিঃশ্বাস পাওয়া যায়, অনুভব করা যায় এক হারানো রাজত্বের মহিমা।
শ্রীলঙ্কা: ভারতের চোখের জল আর রামায়ণের লঙ্কা
শ্রীলঙ্কাকে প্রায়ই বলা হয় “ভারতের চোখের জল” বা “Tear Drop of India” — ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে আলতোভাবে ঝরে পড়া একফোঁটা জলের মতো দ্বীপদেশ। আর এই দ্বীপই সেই রামায়ণের লঙ্কা, যেখানে রাবণ সীতাকে বন্দি করে রেখেছিলেন।
এই স্থানেই রাম বানরসেনা নিয়ে পাড়ি জমিয়ে পৌঁছান স্ত্রীকে উদ্ধার করতে। রাবণ ও রামের যুদ্ধ এখানকার মাটিকেই করেছে ইতিহাসের অংশ।
পর্যটন ও ইতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন
সিগিরিয়া আজ শুধুই এক ঐতিহাসিক স্থান নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে বিশ্ব পর্যটনের এক জনপ্রিয় গন্তব্যে। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এখানে ছুটে আসেন রাবণের ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ দেখার আশায়।
ইতিহাসপ্রেমী হোন কিংবা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, সবার কাছেই সিগিরিয়া এক রহস্যময় বিস্ময়।
ইতিহাসে ডুবে থাকা এক প্রাসাদ
রাবণের নাম নিয়ে যত বিতর্কই থাক, তার শৌর্য-বীর্য ও গৌরব অস্বীকার করা যায় না। সিগিরিয়া সেই গৌরবময় অতীতের এক জীবন্ত চিহ্ন। এখানে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু প্রাচীন এক রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ দেখি না, বরং অনুভব করি সেই সময়ের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও শক্তির নিদর্শন।
আজও সেই পাহাড়ের গায়ে আঁকা প্রাচীন চিত্রকলায়, ইটের গাঁথুনিতে, আর জলাধারের নকশায় রয়ে গেছে রাবণের অনন্য স্থাপত্যবোধের ছাপ।


