বাংলাদেশের ভলিবল ইতিহাসে কিছু নাম চিরকাল অমর হয়ে থাকবে, আর সেই তালিকায় অন্যতম হলো শহীদ আহমদ। তাঁর জীবন, সংগ্রাম, খেলোয়াড়ি সাফল্য ও প্রশিক্ষণ জীবনের অবদান দেশের ক্রীড়া অঙ্গনে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
১৯৫৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর যশোর শহরের কাজীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শহীদ আহমদ। পিতা মোঃ আব্দুল জব্বার, যিনি ডিএসপি পদে দায়িত্বপালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন, আর মাতা একজন গৃহিণী হিসেবে পরিবারকে এগিয়ে নিয়েছেন। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।
শিক্ষাজীবনে তিনি বিকম ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে দীর্ঘ সময় টেলিযোগাযোগ বিভাগ (টি অ্যান্ড টি)-তে দায়িত্ব পালন করেন। তবে শিক্ষাগত ও পেশাগত কাজের পাশাপাশি ক্রীড়ার প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁকে দেশের অন্যতম কৃতী ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে।
শহীদ আহমদের ক্রীড়া জীবনের শুরু ১৯৭৫ সালে, যশোরের ক্রীড়াঙ্গনের তৎকালীন কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব আব্দুল কাদের, সুভাষ বোস, মহসিন আলী, গণেশ বাবু প্রমুখের উৎসাহে।
১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা দলের হয়ে অসংখ্য ম্যাচ খেলেছেন এবং অসংখ্য জয় এনে দিয়েছেন। তাঁর খেলার নৈপুণ্য ও কৌশল তাঁকে খুব দ্রুতই জাতীয় পর্যায়ের দরজায় পৌঁছে দেয়।
১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত শহীদ আহমদ ঢাকা ইস্ট এন্ড ক্লাব-এর সদস্য ছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে দেশের শীর্ষ ভলিবল ক্লাবগুলোর একটি ছিল। এখান থেকেই তিনি জাতীয় দলে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান।
১৯৮২ সালে তিনি এশিয়ান গেমসে জাতীয় ভলিবল দলের সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেন, যা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক।
শহীদ আহমদ শুধু একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং একজন সফল প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-তে প্রশিক্ষণ গ্রহণ। ১৯৯৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি (IOC)-এর কোচিং ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ।
পরবর্তীতে তিনি যশোর জেলা যুবদল, যশোর জেলা দল, এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের আর্মি টিমের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশন আয়োজিত অনূর্ধ্ব-২০ খেলোয়াড় প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে তিনি যশোর-সাতক্ষীরা অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রশিক্ষণে উঠে আসা কৃতী খেলোয়াড়দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—আরিফুল ইসলাম (সেনাবাহিনী), সাইফুল ইসলাম (বিমান বাহিনী)।
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির যশোর শাখা তাঁকে “বর্ষসেরা ভলিবল খেলোয়াড়” হিসেবে নির্বাচিত করে। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ ক্রীড়া জীবনের স্বীকৃতি ও সম্মানের প্রতীক।
শহীদ আহমদ শুধুমাত্র খেলোয়াড় বা প্রশিক্ষক ছিলেন না, বরং একজন নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন।১৯৮৮ সাল থেকে তিনি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।দীর্ঘ সময় ভলিবল পরিষদের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।ইয়ং স্টার ক্লাব ও মিতুল ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সক্রিয় সদস্য হিসেবেও দেশের ভলিবল উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
২০২৫ সালের ১৭ই এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন, রেখে যান অসংখ্য স্মৃতি, সাফল্য ও ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন দাগ। তাঁর অবদান যশোর তথা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শহীদ আহমদ ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের শ্রম, অধ্যবসায় ও ভালোবাসা দিয়ে বাংলাদেশে ভলিবল খেলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের কৃতিত্ব এবং প্রশিক্ষক হিসেবে অবদান দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের ভলিবল জগতে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে গর্বের সাথে, আর তাঁর পথ অনুসরণ করবে অসংখ্য তরুণ খেলোয়াড়।
শহীদ আহমদের জীবনগাথা প্রমাণ করে—একজন খেলোয়াড় শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরে থেকেও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারেন। তিনি ছিলেন খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক, সংগঠক—তিন ভূমিকাতেই সমান দক্ষ ও প্রেরণাদায়ী।


