বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬
29.7 C
Jessore
More

    শরফা বাজি: গ্রামীণ ঐতিহ্যের উড়ন্ত গল্প, ইতিহাস থেকে বর্তমান বাস্তবতা

    বাংলার গ্রামীণ জীবনে এমন অনেক খেলাধুলা আছে, যেগুলো খুব সাধারণ জিনিস দিয়েই তৈরি, কিন্তু আনন্দে ভরপুর। শরফা বাজি ঠিক তেমনই একটি খেলা। অনেকেই একে শরফা নামে চেনেন, কেউ আবার ভিন্ন নামে ডাকেন। নাম যাই হোক, এই খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, কল্পনা আর গ্রামের

    মানুষের সহজ জীবনধারা।


    আজকাল শহরে বড় হওয়া অনেক ছেলেমেয়েই শরফা বাজির নাম শোনেনি। অথচ এক সময় এই খেলাই ছিল বিকেলের আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, আর বড়দের কাছ থেকে শেখার একটা সুন্দর সুযোগ।

    শরফা বাজি কী এবং এর পরিচয়



    শরফা বাজি মূলত একটি উড়ন্ত খেলনা। কাগজ বা প্লাস্টিক নয়, বরং কচু পাতা বা তারো পাতাই এর প্রধান উপাদান। পাতাকে বিশেষভাবে কেটে, ভাঁজ করে আর হালকা বাঁশ বা কাঠির সাহায্যে এমনভাবে বানানো হয়, যাতে বাতাসে ছুড়ে দিলে সেটা দূরে উড়ে যায়।


    এটা ঘুড়ির মতো সুতো দিয়ে ওড়ানো হয় না। বরং একবার ছুড়ে দিলেই সবাই তাকিয়ে থাকে, কত দূর যায়, কতক্ষণ বাতাসে ভাসে। এই দেখাটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।

    শরফা বাজির ইতিহাস: খেজুর রস থেকে খেলাধুলা



    শরফা বাজির জন্ম কিন্তু খেলনা হিসেবে নয়। এর শুরু হয়েছিল গ্রামীণ কাজকর্ম থেকে। আগে গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করা হতো। সেই কাজে ব্যবহৃত অনেক কাটা অংশ, পাতা বা বাড়তি জিনিস পড়ে থাকত।

    আরও পড়ুন :  বাংলা ১৩২৯ সালে যশোর শহরে আবিষ্কৃত বিরল বিষ্ণুমূর্তি ও প্রত্নসম্পদের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ


    গ্রামের মানুষ লক্ষ্য করলেন, এই ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়েই মজার কিছু বানানো যায়। কচু পাতা, খেজুর পাতার অংশ আর বাঁশের চিকন কাঠি মিলিয়ে তৈরি হলো শরফা বাজি। ধীরে ধীরে এটা শুধু কাজের ফাঁকে বানানো জিনিস না থেকে একটি জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়।

    শরফা বাজি বানানোর সহজ পদ্ধতি



    এই খেলাটার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এর জন্য আলাদা করে কিছু কিনতে হয় না। যা লাগে, সবই হাতের কাছেই পাওয়া যায়।


    প্রথমে একটি বড় ও তাজা কচু পাতা নেওয়া হয়। পাতাটাকে সাবধানে কেটে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এরপর পাতার মাঝখানে বা নিচের দিকে চিকন বাঁশ বা কাঠি বসানো হয়, যাতে ভারসাম্য ঠিক থাকে। কখনো কখনো সামান্য সুতো ব্যবহার করা হয়, যাতে উড়ার সময় পাতাটা উল্টে না যায়।


    সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারসাম্য। ঠিকভাবে বানানো হলে শরফা বাজি বাতাসে খুব মসৃণভাবে উড়ে যায়।

    গ্রামীণ জীবনে শরফা বাজির গুরুত্ব



    আগে শরফা বাজি শুধু খেলা ছিল না, এটা ছিল শেখার একটা মাধ্যম। শিশুরা নিজের হাতে কিছু বানাতে শিখত। কোন পাতা ভালো, কীভাবে কাটলে ভালো উড়বে, বাতাসের দিক কোনটা—এসব বুঝতে শিখত খেলতে খেলতেই।


    স্কুল শেষে বা মাঠের কাজের পর বিকেলে সবাই একসঙ্গে জড়ো হতো। কেউ বানাত, কেউ ছুড়ত, কেউ হিসাব করত কারটা বেশি দূর গেল। বড়রা পাশে দাঁড়িয়ে পরামর্শ দিতেন। এতে প্রজন্মের মধ্যে একটা সুন্দর যোগাযোগ তৈরি হতো।

    আরও পড়ুন :  ‘টোয়াইলাইট’ এর রিমেক করতে চান ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট: ফিরতে পারে ভ্যাম্পায়ার জাদু

    শরফা বাজি এবং সামাজিক বন্ধন



    এই খেলাটা গ্রামের মানুষকে কাছে এনেছে। কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না জেতা-হারার। ছিল শুধু আনন্দ আর হাসি। একসঙ্গে মাঠে দাঁড়িয়ে উড়ন্ত শরফার দিকে তাকিয়ে থাকা, এটা এক ধরনের মিলনমেলা ছিল।


    অনেক সময় গ্রাম্য মেলা বা উৎসবে শরফা বাজি দেখানো হতো। নতুন প্রজন্মকে পুরোনো দিনের গল্প শোনানোর একটা উপলক্ষও ছিল এটা।

    আধুনিক সময়ে শরফা বাজির বিলুপ্তি



    সময় বদলেছে। এখন শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ভিডিও গেম। প্লাস্টিকের খেলনা সহজে পাওয়া যায়। ফলে শরফা বাজির মতো ধৈর্য আর হাতে বানানোর খেলাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।


    আরেকটা বড় কারণ হলো খেজুর রস সংগ্রহ কমে যাওয়া। আগে যেভাবে খেজুর গাছের কাজ হতো, এখন তা অনেক জায়গায় আর দেখা যায় না। এর ফলে শরফা বাজির কাঁচামাল আর পরিবেশ দুটোই কমে গেছে।

    এখনও কোথায় টিকে আছে শরফা বাজি



    সব জায়গা থেকে কিন্তু শরফা বাজি হারিয়ে যায়নি। এখনো কিছু গ্রামে বয়স্ক মানুষরা এই খেলাটার কথা মনে রাখেন। কেউ কেউ নাতি-নাতনিদের শেখান। গ্রামীণ সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানে বা মেলায় মাঝে মাঝে শরফা বাজি প্রদর্শন করা হয়।


    এটা এখন শুধু খেলা নয়, বরং স্মৃতির প্রতীক। একটা সময়ের গল্প, যখন আনন্দের জন্য দামি কিছু লাগত না।

    আরও পড়ুন :  ফোন উদ্ধারে সমুদ্রে ঝাঁপ মদ্যপ তরুণের, সাড়ে চার ঘণ্টা ভেসেও অক্ষত প্রাণ

    কেন শরফা বাজি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ



    শরফা বাজি আমাদের শেখায়, আনন্দ খুব সাধারণ জায়গা থেকেই আসতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, নিজের হাতে কিছু বানানোর আনন্দ, আর একসঙ্গে সময় কাটানোর সুখ—সবকিছুই এতে আছে।


    আজকের শিশুদের জন্য এই খেলাটা শুধু বিনোদন নয়, বরং শেখার সুযোগও হতে পারে। এতে সৃজনশীলতা বাড়ে, ধৈর্য শেখা যায়, আর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়।

    শরফা বাজি সংরক্ষণের প্রয়োজন



    আমরা যদি চাই, এই ঐতিহ্য হারিয়ে না যাক, তাহলে উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলে গ্রামীণ খেলাধুলা নিয়ে আয়োজন হতে পারে। স্থানীয় মেলায় শিশুদের দিয়ে শরফা বাজি বানানোর প্রতিযোগিতা করা যেতে পারে।


    এভাবে নতুন প্রজন্ম জানবে, তাদের শেকড় কোথায়, আর কীভাবে সাধারণ জীবনেও গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে।

    উপসংহার



    শরফা বাজি শুধুই একটি খেলা নয়। এটা গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো ইতিহাস। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এক সময় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচত, আর সামান্য পাতাও হয়ে উঠত আনন্দের উৎস।


    আজ হয়তো এই খেলাটা চোখে পড়ে না, কিন্তু স্মৃতিতে আর সংস্কৃতিতে এর জায়গা এখনো আছে। যদি আমরা চাই, একটু যত্ন নিলেই শরফা বাজি আবার নতুন করে উড়তে পারে—ঠিক গ্রামের খোলা আকাশের মতোই।

    লেটেস্ট আপডেট

    ঢাকায় ভোট দিলেন তারেক রহমান ও জাইমা: সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ছবি

    বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জোবাইদা রহমান ও...

    “ভোট নিয়ে বড় মন্তব্য তারেক রহমানের: দেশ চালানোর আসন আশা করছেন”

    জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক...

    দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা! নির্বাচন ঘিরে বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর থেকেই দেশের পররাষ্ট্রনীতির...

    ভোটকেন্দ্রে এসে তারেক রহমানের বড় বার্তা: ষড়যন্ত্র রুখতে ভোট দিন

    মানুষ ভোটকেন্দ্রে এলেই যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব বলে...

    ভোটার উপস্থিতি কম! সংসদ ও গণভোটের সকালের বাস্তব চিত্র দেখুন

    বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে...

    বাছাই সংবাদ

    দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক নিয়ে বড় বার্তা! নির্বাচন ঘিরে বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রকাশ

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর থেকেই দেশের পররাষ্ট্রনীতির...

    ভোটকেন্দ্রে এসে তারেক রহমানের বড় বার্তা: ষড়যন্ত্র রুখতে ভোট দিন

    মানুষ ভোটকেন্দ্রে এলেই যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব বলে...

    ভোটার উপস্থিতি কম! সংসদ ও গণভোটের সকালের বাস্তব চিত্র দেখুন

    বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ চলছে...

    লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন হাজারো মানুষ! যশোরে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের চিত্র

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে যশোর জেলার...

    “বিভিন্ন জায়গায় সিল মারার চেষ্টা” – ভোট দিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ রুমিনের

    ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের আংশিক)...
    00:02:27

    শীত ভেঙে ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন! নড়াইল-১ ও ২ আসনে জমজমাট ভোট

    নড়াইলের দুটি সংসদীয় আসনেই বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে...

    ভোট কেনাবেচা নিয়ে কড়া বার্তা! কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি নির্বাচন কমিশনের

    ভোট কেনাবেচার বিষয়ে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে...

    ভোটের আগে টাকা, কেন্দ্র দখল ও হুমকি—জামায়াতকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

    নির্বাচনের ঠিক আগের রাত—যে সময়টা সাধারণত সবচেয়ে স্পর্শকাতর বলে...

    এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

    জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

    Translate »