বাংলার গ্রামীণ জীবনে এমন অনেক খেলাধুলা আছে, যেগুলো খুব সাধারণ জিনিস দিয়েই তৈরি, কিন্তু আনন্দে ভরপুর। শরফা বাজি ঠিক তেমনই একটি খেলা। অনেকেই একে শরফা নামে চেনেন, কেউ আবার ভিন্ন নামে ডাকেন। নাম যাই হোক, এই খেলাটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতি, কল্পনা আর গ্রামের
মানুষের সহজ জীবনধারা।
আজকাল শহরে বড় হওয়া অনেক ছেলেমেয়েই শরফা বাজির নাম শোনেনি। অথচ এক সময় এই খেলাই ছিল বিকেলের আনন্দ, বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, আর বড়দের কাছ থেকে শেখার একটা সুন্দর সুযোগ।
শরফা বাজি কী এবং এর পরিচয়
শরফা বাজি মূলত একটি উড়ন্ত খেলনা। কাগজ বা প্লাস্টিক নয়, বরং কচু পাতা বা তারো পাতাই এর প্রধান উপাদান। পাতাকে বিশেষভাবে কেটে, ভাঁজ করে আর হালকা বাঁশ বা কাঠির সাহায্যে এমনভাবে বানানো হয়, যাতে বাতাসে ছুড়ে দিলে সেটা দূরে উড়ে যায়।
এটা ঘুড়ির মতো সুতো দিয়ে ওড়ানো হয় না। বরং একবার ছুড়ে দিলেই সবাই তাকিয়ে থাকে, কত দূর যায়, কতক্ষণ বাতাসে ভাসে। এই দেখাটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।
শরফা বাজির ইতিহাস: খেজুর রস থেকে খেলাধুলা
শরফা বাজির জন্ম কিন্তু খেলনা হিসেবে নয়। এর শুরু হয়েছিল গ্রামীণ কাজকর্ম থেকে। আগে গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করা হতো। সেই কাজে ব্যবহৃত অনেক কাটা অংশ, পাতা বা বাড়তি জিনিস পড়ে থাকত।
গ্রামের মানুষ লক্ষ্য করলেন, এই ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়েই মজার কিছু বানানো যায়। কচু পাতা, খেজুর পাতার অংশ আর বাঁশের চিকন কাঠি মিলিয়ে তৈরি হলো শরফা বাজি। ধীরে ধীরে এটা শুধু কাজের ফাঁকে বানানো জিনিস না থেকে একটি জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়।
শরফা বাজি বানানোর সহজ পদ্ধতি
এই খেলাটার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এর জন্য আলাদা করে কিছু কিনতে হয় না। যা লাগে, সবই হাতের কাছেই পাওয়া যায়।
প্রথমে একটি বড় ও তাজা কচু পাতা নেওয়া হয়। পাতাটাকে সাবধানে কেটে নির্দিষ্ট আকার দেওয়া হয়। এরপর পাতার মাঝখানে বা নিচের দিকে চিকন বাঁশ বা কাঠি বসানো হয়, যাতে ভারসাম্য ঠিক থাকে। কখনো কখনো সামান্য সুতো ব্যবহার করা হয়, যাতে উড়ার সময় পাতাটা উল্টে না যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভারসাম্য। ঠিকভাবে বানানো হলে শরফা বাজি বাতাসে খুব মসৃণভাবে উড়ে যায়।
গ্রামীণ জীবনে শরফা বাজির গুরুত্ব
আগে শরফা বাজি শুধু খেলা ছিল না, এটা ছিল শেখার একটা মাধ্যম। শিশুরা নিজের হাতে কিছু বানাতে শিখত। কোন পাতা ভালো, কীভাবে কাটলে ভালো উড়বে, বাতাসের দিক কোনটা—এসব বুঝতে শিখত খেলতে খেলতেই।
স্কুল শেষে বা মাঠের কাজের পর বিকেলে সবাই একসঙ্গে জড়ো হতো। কেউ বানাত, কেউ ছুড়ত, কেউ হিসাব করত কারটা বেশি দূর গেল। বড়রা পাশে দাঁড়িয়ে পরামর্শ দিতেন। এতে প্রজন্মের মধ্যে একটা সুন্দর যোগাযোগ তৈরি হতো।
শরফা বাজি এবং সামাজিক বন্ধন
এই খেলাটা গ্রামের মানুষকে কাছে এনেছে। কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না জেতা-হারার। ছিল শুধু আনন্দ আর হাসি। একসঙ্গে মাঠে দাঁড়িয়ে উড়ন্ত শরফার দিকে তাকিয়ে থাকা, এটা এক ধরনের মিলনমেলা ছিল।
অনেক সময় গ্রাম্য মেলা বা উৎসবে শরফা বাজি দেখানো হতো। নতুন প্রজন্মকে পুরোনো দিনের গল্প শোনানোর একটা উপলক্ষও ছিল এটা।
আধুনিক সময়ে শরফা বাজির বিলুপ্তি
সময় বদলেছে। এখন শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ভিডিও গেম। প্লাস্টিকের খেলনা সহজে পাওয়া যায়। ফলে শরফা বাজির মতো ধৈর্য আর হাতে বানানোর খেলাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরেকটা বড় কারণ হলো খেজুর রস সংগ্রহ কমে যাওয়া। আগে যেভাবে খেজুর গাছের কাজ হতো, এখন তা অনেক জায়গায় আর দেখা যায় না। এর ফলে শরফা বাজির কাঁচামাল আর পরিবেশ দুটোই কমে গেছে।
এখনও কোথায় টিকে আছে শরফা বাজি
সব জায়গা থেকে কিন্তু শরফা বাজি হারিয়ে যায়নি। এখনো কিছু গ্রামে বয়স্ক মানুষরা এই খেলাটার কথা মনে রাখেন। কেউ কেউ নাতি-নাতনিদের শেখান। গ্রামীণ সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানে বা মেলায় মাঝে মাঝে শরফা বাজি প্রদর্শন করা হয়।
এটা এখন শুধু খেলা নয়, বরং স্মৃতির প্রতীক। একটা সময়ের গল্প, যখন আনন্দের জন্য দামি কিছু লাগত না।
কেন শরফা বাজি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
শরফা বাজি আমাদের শেখায়, আনন্দ খুব সাধারণ জায়গা থেকেই আসতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, নিজের হাতে কিছু বানানোর আনন্দ, আর একসঙ্গে সময় কাটানোর সুখ—সবকিছুই এতে আছে।
আজকের শিশুদের জন্য এই খেলাটা শুধু বিনোদন নয়, বরং শেখার সুযোগও হতে পারে। এতে সৃজনশীলতা বাড়ে, ধৈর্য শেখা যায়, আর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়।
শরফা বাজি সংরক্ষণের প্রয়োজন
আমরা যদি চাই, এই ঐতিহ্য হারিয়ে না যাক, তাহলে উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলে গ্রামীণ খেলাধুলা নিয়ে আয়োজন হতে পারে। স্থানীয় মেলায় শিশুদের দিয়ে শরফা বাজি বানানোর প্রতিযোগিতা করা যেতে পারে।
এভাবে নতুন প্রজন্ম জানবে, তাদের শেকড় কোথায়, আর কীভাবে সাধারণ জীবনেও গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে।
উপসংহার
শরফা বাজি শুধুই একটি খেলা নয়। এটা গ্রামীণ জীবনের এক টুকরো ইতিহাস। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এক সময় মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচত, আর সামান্য পাতাও হয়ে উঠত আনন্দের উৎস।
আজ হয়তো এই খেলাটা চোখে পড়ে না, কিন্তু স্মৃতিতে আর সংস্কৃতিতে এর জায়গা এখনো আছে। যদি আমরা চাই, একটু যত্ন নিলেই শরফা বাজি আবার নতুন করে উড়তে পারে—ঠিক গ্রামের খোলা আকাশের মতোই।


