বাংলার মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন। তার মধ্যে অন্যতম সিদ্ধিপাশা জমিদারবাড়ি, যা যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার সিদ্ধিপাশা গ্রামে অবস্থিত। শতাব্দী প্রাচীন এই স্থাপনা শুধু একটি জমিদার বাড়িই নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ সমাজজীবনের অসংখ্য ঘটনার সাক্ষ্য বহন করছে। আজও এটি দাঁড়িয়ে আছে অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের এক নীরব প্রহরী হয়ে।
আলীবর্দি খানের শাসনামলে (১৭৪০-১৭৬৫), ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে সুবোল ভদ্র নামে এক ব্যক্তি নড়াইলের কচুবাড়ি থেকে এসে ভৈরব নদীর তীরে সিদ্ধিপাশা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধর কাশীনাথ ভদ্র ইংরেজ সরকারের নিলামে জমিদারি ক্রয় করেন চাঁচড়া রাজার দেওয়ান হরিরাম মিত্রের সহায়তায়।
কাশীনাথের ছেলে প্রাণহরি ভদ্র ছিলেন প্রকৃত স্থপতি। তিনি ১৯১০ সালে প্রায় ৭ বিঘা জমির উপর সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধিপাশা জমিদারবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে এই অনিন্দ্যসুন্দর প্রাসাদ, যা আজও ইতিহাসপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।
এই জমিদারবাড়ি শুধু আয়তনে বিশাল নয়, এর প্রতিটি অংশেই রয়েছে শিল্পসৌন্দর্যের ছোঁয়া। বাড়িটিতে ছিল—
- কাছারি ঘর
- পাঠকক্ষ
- দুটি মণ্ডপ
- এল-আকৃতির অন্দরমহল
- রান্নাঘর
- বাজনদার ঘর
বাড়ির পশ্চিমে রয়েছে বিশাল ইন্দ্রকূপ, যেখান থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জল তোলা হতো। কাছারি বাড়ির সূক্ষ্ম কারুকাজ এখনো প্রমাণ করে জমিদার পরিবারের ঐশ্বর্য ও রুচিশীলতা।
প্রাণহরি ভদ্রের দুই ছেলে রবীন্দ্রনাথ ভদ্র ও যতীন্দ্রনাথ ভদ্র জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। তাঁদের উত্তরসূরিদের মধ্যে যোগেন্দ্রনাথ ভদ্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যিনি খুলনা কারাগারের প্রধান ফটক নির্মাণ করেছিলেন। দেশবিভাগের পর জমিদার পরিবারের অনেক সদস্য ভারতসহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেলেও বাড়িটি থেকে গেছে ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে।
জমিদারবাড়িতে ছিল দুটি মণ্ডপ—একটি নারায়ণ মন্দির, অন্যটি দুর্গামন্দির। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাড়ির আসবাবপত্র, দরজা-জানালা ও মন্দিরের ধনসম্পদ লুট হলেও স্থাপত্য সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকে। আজও ভ্রমণকারীরা এ বাড়িতে এসে বিস্ময়ে অভিভূত হন।
প্রাণহরি ভদ্র ১৩০৯ বঙ্গাব্দে ভৈরব নদীর তীরে দোলমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতি বসন্তে এখানে অনুষ্ঠিত হতো বসন্ত উৎসব, যা স্থানীয়দের মনে এখনো রয়ে গেছে।
অন্যদিকে, জমিদার শরৎকুমার হোড় তাঁর মাতা হেমন্তকুমারীর স্মরণে ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন সিদ্ধিপাশা হেমন্তকুমারী দাতব্য চিকিৎসালয়। এটির উদ্বোধন করেছিলেন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী স্যার পি.সি. রায়। চিকিৎসালয়টি স্থানীয় মানুষের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ ছিল।
চিকিৎসালয়ের পাশে ছিল সোনাতলা ভদ্রঘাট, যা গ্রামীণ জনজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। পাশাপাশি সতীশচন্দ্র দত্ত তাঁর পিতা বিপিন বিহারী দত্তের স্মৃতিতে নির্মাণ করেন আরেকটি ঘাট, যা আজও স্থানীয় ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করছে।
আজকের দিনে জমিদারবাড়ি নিঃশব্দ ও অনেকটাই জনমানবশূন্য। যদিও জমিদার পরিবারের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তবে তাঁদের বংশধররা এখনো এখানে বসবাস করেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত যতীন্দ্রনাথ ভদ্রের তিন ছেলে—জয়ন্ত ভদ্র, অচিন্ত্য কুমার ভদ্র ও প্রেমেন্দ্র ভদ্র—এই বাড়িতে অবস্থান করতেন।
যশোরের অভয়নগরের নোয়াপাড়া বাজার থেকে ভৈরব নদী পার হয়ে অথবা সিঙ্গাড়ী, চাকোই, বাশুয়াড়ী, লেবুগাতী, হিদিয়া, ইছামতি ও নাউলী হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় সিদ্ধিপাশায়। ফলে ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি একটি সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় গন্তব্য।
সত্যিই, সিদ্ধিপাশা জমিদারবাড়ি শুধু ইট-পাথরের একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলার জমিদার যুগের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ সমাজের প্রতীক। এর প্রতিটি দেয়ালে লুকিয়ে আছে অতীতের গল্প, আভিজাত্য ও স্মৃতিচিহ্ন। দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে আজও এটি ভ্রমণকারীদের মনে গভীর ছাপ ফেলে যায়।
👉 সিদ্ধিপাশা জমিদারবাড়ি ভ্রমণ করলে ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির যে সমন্বয় দেখা যায়, তা সত্যিই অনন্য। এটি শুধু যশোর নয়, গোটা বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
✍️ জীবনী ও তথ্যসংগ্রহ: সাজেদ রহমান | যশোর 📅 প্রকাশকাল: ২৬ আগস্ট ২০২৫


