বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য নাম মোঃ সফিউল ইসলাম সফি, যিনি খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে দেশীয় ফুটবলে নিজের এক আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। ১৯৫৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি যশোর জেলার শেখহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পরিবার ক্রীড়া ও সামাজিক নেতৃত্বে বিশেষভাবে সক্রিয় ছিল। পিতা তবিবর রহমান ছিলেন একজন ক্রীড়া সংগঠক এবং চাচা হাফিজুর রহমান ছিলেন একজন ফুটবল রেফারি ও সংগঠক। সাত ভাই ও আট বোনের ভেতরে তিনি ষষ্ঠ।
শুরুর দিকের ক্রীড়া যাত্রা ও স্কুল পর্যায়ে সাফল্য
মোঃ সফি ক্রীড়া জীবনের শুরু করেন যশোর জেলার শার্শা উপজেলার নাভারণ বুরুজবাগান হাই স্কুল এবং খয়েরতলা হাই স্কুল থেকে। ১৯৬৯ সালে তিনি মুসলিম একাডেমী হাই স্কুল হতে যশোর জেলার চ্যাম্পিয়ন নির্বাচিত হন। ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর ফুটবল প্রতিভা দারুণভাবে বিকশিত হয়।
তারপর, ১৯৭৩ সালে এম এম কলেজ থেকে জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেন এবং ১৯৭৪ সালে সিটি কলেজ হতে খেলেন, যেখানে চারটি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে রানার্স আপ হন। এই সময় থেকেই বোঝা যায়, তিনি দেশের ফুটবল অঙ্গনে এক শক্তিশালী প্রতিযোগী হয়ে উঠবেন।
পারিবারিক অনুপ্রেরণা ও ক্রীড়া পরিবার
সফির পরিবার নিজেই ছিল এক ক্রীড়া অনুপ্রেরণার উৎস। বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম ছিলেন ক্রীড়া সংগঠক এবং যশোর নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। এমন পরিবেশে বড় হওয়ায়, ক্রীড়া চেতনা তাঁর মধ্যে সহজেই গেঁথে যায়।
তাঁর পুত্র রাকিবুল ইসলামও পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করেন। তিনি ঢাকা “জীবন বীমা”, “বি জি প্রেস” এবং পরে জুরাইন জনতা ক্লাবের ফুটবল দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন।
যশোর ফুটবল লীগে চ্যাম্পিয়নের ধারাবাহিকতা
১৯৬৯-১৯৭০ সালে সফি “ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাব”-এ খেলে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন। এরপর ১৯৭২-১৯৭৩ সালে “যুব একাদশ”-এর হয়ে খেলেন এবং চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে তিনি “টাউন ক্লাব”-এর হয়ে খেলেন এবং আবারও চ্যাম্পিয়ন হন।
এই সময়ে, যশোর ফুটবল লীগে তিনি ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ পারফর্মার ছিলেন, যা তাঁর ক্রীড়াজীবনের ভিত্তি শক্ত করে তোলে।
খুলনা ও ঢাকায় বিভিন্ন ক্লাবে অসাধারণ অবদান
খুলনায় তিনি ১৯৬৯ সালে “ফায়ার সার্ভিস”, ১৯৭০ সালে “ইয়ং মুসলিম ক্লাব” এবং ১৯৭২-১৯৭৪ সালে “ব্যাংকার্স ক্লাব”-এর হয়ে খেলেন। এই ক্লাবগুলোতে তিনি কৌশল, স্কিল এবং দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
ঢাকায় ১৯৬৯ ও ১৯৭৩ সালে “দিলকুশা ক্লাব” এবং ১৯৭০ ও ১৯৭৫ সালে “ভিক্টোরিয়া ক্লাব”-এ প্রথম বিভাগে খেলে নিজের জাত চেনান। এই সময়ে, ঢাকার মাঠে তিনি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
জেলার গণ্ডি পেরিয়ে চট্টগ্রাম ও কুষ্টিয়ায় পেশাদার ফুটবল
চট্টগ্রামে, ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে “পিডব্লিউডি” এবং ১৯৭৫ সালে “আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাব”-এর হয়ে খেলেন। এই দুটি ক্লাবেই তিনি ছিলেন প্রধান স্ট্র্যাটেজি নির্মাতা। কুষ্টিয়ায় “কুষ্টিয়া হাউজিং একাদশ”-এ খেলে, তিনি আরও একবার ফুটবল ভক্তদের মুগ্ধ করেন।
জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও রেফারিং ক্যারিয়ার
১৯৭০ সালে, পাকিস্তানি কোচ সুন্না রশিদের নিকট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি পেশাদারিত্বের আরেকটি দিগন্তে পৌঁছে যান। কোচিং গ্রহণের পর তিনি নিজেই পরবর্তীতে এক শক্তিশালী মেন্টর হয়ে ওঠেন তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য।
১৯৯০ সালে, তিনি ফুটবল রেফারির তৃতীয় শ্রেণীর প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হন। তিনি যশোর ফুটবল রেফারী সমিতির সদস্য এবং “তরুণ সংঘ”-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের গাইড করার সুযোগ পান।
শিক্ষা ও পেশাজীবন
শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এইচএসসি। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। এই পেশার মাধ্যমে তিনি ফুটবলের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন।
মোঃ সফিউল ইসলাম সফি: একটি অনুপ্রেরণার নাম
মোঃ সফি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি ক্রীড়া ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তাঁর প্রতিভা, নিষ্ঠা ও সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
তিনি নিজেকে শুধু মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও প্রমাণ করেছেন—একজন ক্রীড়াবিদ, সংগঠক, রেফারি, এবং সমাজসেবী হিসেবে।
তাঁর অবদান জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে অবিস্মরণীয়
মোঃ সফিউল ইসলাম সফির জীবনকাহিনী প্রমাণ করে, একজন খেলোয়াড়ের সংগ্রাম, সাফল্য এবং আত্মত্যাগ কতটা গভীরভাবে সমাজ ও জাতিকে প্রভাবিত করতে পারে। যশোরের মতো জেলা শহর থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভা তুলে ধরার এই গল্প আমাদের সকলকে প্রেরণা দেয়।


