শুরুতেই পরিচয়: একটি অনন্য ক্রীড়া যাত্রার সূচনা
মোঃ তারিকউজ্জামান নান্নু—বাংলাদেশের হকি ইতিহাসে এক অনন্য নাম, যিনি খেলোয়াড়, কোচ ও সংগঠক হিসেবে দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে রেখেছেন উজ্জ্বল ভূমিকা। তাঁর জন্ম ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি, যশোর শহরের খড়কি এলাকায়। পিতা মৌলভী মোঃ শাহাদত আলী এবং নয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর পরিবারটি নিজ গুণে ছিল কৃতিত্বে উজ্জ্বল—বড় ভাই ডঃ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান যথাক্রমে শিক্ষা ও সাহিত্য এবং সঙ্গীত ও চিত্রকলায় সুপ্রতিষ্ঠিত নাম।
শিক্ষাজীবন ও পেশাগত প্রতিষ্ঠা
তারিকউজ্জামান নান্নু তাঁর শিক্ষা জীবন শেষ করেন ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস ডিগ্রী লাভের মাধ্যমে। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিদপ্তরে ঢাকা জেলা ক্রীড়া অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
হকি খেলোয়াড় হিসেবে গৌরবময় অবদান
যশোর জেলা দল ও অধিনায়কত্বের ইতিহাস
তারিকউজ্জামান নান্নুর হকি খেলার পথচলা শুরু হয় ১৯৭৭ সালে যশোর জেলা যুব হকি দলের হয়ে। তিনি ১৯৭৯ সালে যুব দলের এবং ১৯৮৫ সালে সিনিয়র দলের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত যশোর জেলার প্রতিনিধিত্ব করা এই ক্রীড়াবিদের নৈপুণ্য ছিল অতুলনীয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব
তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হকি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এবং ১৯৯২ সালে অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন। জাতীয় হকি প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশ গেমস-এ অংশ নিয়ে তাঁর দলকে একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন বানাতে সহায়তা করেন।
ক্লাব ক্যারিয়ার: মোহামেডান ও আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব
তারিকউজ্জামান নান্নু ঢাকা প্রথম বিভাগ হকি লীগে খেলেছেন আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের (১৯৮২-৮৩) হয়ে এবং দীর্ঘদিন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের (১৯৮৪-১৯৯৬) গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ও সামিট কাপ
এই প্রতিভাবান খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেন সামিট কাপ আন্তর্জাতিক হকি টুর্নামেন্টে (১৯৮৯-৯০) এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় তার দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন অত্যন্ত সফলতার সাথে।
কোচিং ও প্রশিক্ষক হিসেবে অবদান
তারিকউজ্জামান নান্নু শুধু একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন না, ছিলেন একজন দক্ষ প্রশিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হকি দল, নারায়ণগঞ্জ জেলা দল, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড যুব হকি দল এবং জাতীয় স্কুল হকি দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কোচ হিসেবে অর্জনসমূহ
- জাতীয় হকি প্রতিযোগিতা ১৯৯৫ – চ্যাম্পিয়ন
- ষষ্ঠ বাংলাদেশ গেমস ১৯৯৬ – চ্যাম্পিয়ন
- জাতীয় যুব হকি প্রতিযোগিতা ১৯৯৯ – তৃতীয়
- জাতীয় স্কুল হকি প্রতিযোগিতা ১৯৯৪ – চ্যাম্পিয়ন
- আন্তঃবাহিনী হকি প্রতিযোগিতা ২০০১ – চ্যাম্পিয়ন
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও কোর্স সম্পন্ন
তারিকউজ্জামান নান্নু ক্রীড়া প্রশিক্ষণের জন্য অংশ নিয়েছেন একাধিক আন্তর্জাতিক কোর্সে:
- হকি কোচেস ট্রেনিং কোর্স – ১৯৯৫
- আইওসি সলিডারিটি স্পোর্টস লিডারশিপ কোর্স – ১৯৯১
- অস্ট্রেলিয়ান স্পোর্টস কমিশন সেমিনার – ১৯৯৭
- জার্মানির ন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটি আয়োজিত হকি কোচেস ক্লিনিক – ১৯৯৮
ক্রীড়া প্রশাসনে দায়িত্ব ও অবদান
তারিকউজ্জামান নান্নু বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন, ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থা, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হকি কমিটি ও বিএসটিআই স্পোর্টস গুডস শাখা কমিটিতে সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি হকি খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা দপ্তর সম্পাদক এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সামাজিক ও সাংগঠনিক ভূমিকা
তিনি ঢাকা জেলা স্কাউটের সদস্য এবং দীর্ঘ ১৫ বছর (১৯৮৪-১৯৯৯) যশোরের আসাদ স্মৃতি সংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ক্রীড়াঙ্গনের বাইরেও তাঁকে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে অবদান
তারিকউজ্জামান নান্নু ছিলেন পাক্ষিক “খেলার ভুবন” পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক (১৯৯১-১৯৯৪)। তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে লেখালেখি করেন। তাঁর লেখা ক্রীড়াবিষয়ক অনেক প্রবন্ধ প্রশংসিত ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি
১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে তিনি বর্ষসেরা হকি খেলোয়াড় নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি, যশোর জেলা শাখা দ্বারা। এটি তাঁর অসামান্য প্রতিভা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি স্বরূপ।
মোঃ তারিকউজ্জামান নান্নুর জীবন কাহিনি হলো একজন খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক, সংগঠক ও ক্রীড়া প্রশাসকের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য এক প্রেরণাদায়ক আদর্শ। হকি খেলার উন্নয়ন, খেলোয়াড়দের কল্যাণ ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।


