যশোর-মাগুরা সড়কের কোদালিয়া মোড় থেকে পশ্চিমে পাকা সড়ক ধরে মাত্র দুই কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়বে শান্ত, স্নিগ্ধ গ্রাম—বীরনারায়ণপুর। গ্রামে ঢোকার পথ যেন সময়ের সুড়ঙ্গ—সবুজ শস্যক্ষেত আর গ্রামীণ জীবনের প্রশান্তি পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় বহু শতাব্দী পুরনো ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে। গ্রামের কেন্দ্রস্থলে তেরোআউলিয়াতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়, আর তার পশ্চিমে রয়েছে এক রহস্যঘেরা প্রত্নস্থল—তেরো আউলিয়ার মাজার ও ঢিবি।
এই স্থানের নাম শুনলেই প্রশ্ন জাগে—কারা ছিলেন এই তেরো আউলিয়া?
ইতিহাসের পাতা এ বিষয়ে নির্দিষ্ট উত্তর দেয় না। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, তাঁরা সম্ভবত হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর অনুসারী সুফি সাধক, যারা ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, এই স্থানেই তাঁদের সমাধি রয়েছে, যা যুগের পর যুগ ধরে স্থানীয়দের প্রার্থনার কেন্দ্র হয়ে আছে।
ঢিবিটি চারপাশের সমতল ভূমি থেকে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু। মাঝারি আকারের এক বটগাছের ছায়ায় লুকিয়ে আছে বর্গাকার পাতলা টালি ইটের ভাঙা দেয়ালের অংশ—যা স্থানীয়রা তেরো আউলিয়ার মাজারের ধ্বংসাবশেষ বলে বিশ্বাস করেন।
চারদিকে ছড়িয়ে আছে-পুরনো মৃৎপাত্রের টুকরো, চুন-সুরকির খণ্ডাংশ, ভগ্ন প্রাচীরের চিহ্ন।
এসব নিদর্শন নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়—একসময় এখানে ছিল মানুষের বসতি, সংস্কৃতির বিকাশ ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র।
২০১০ সালের দিকে মূল মাজারটি সিমেন্ট ও বালু দিয়ে সংস্কার করা হয়। যদিও এতে দর্শনার্থীদের জন্য স্থানটি কিছুটা সুগম হয়েছে, তবুও হারিয়ে গেছে অনেকটা প্রাচীন স্থাপত্যের স্বকীয়তা। প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এ পরিবর্তন অমূল্য প্রমাণ হারানোর শঙ্কা তৈরি করেছে।
বীরনারায়ণপুরের এই স্থানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বহু লোকজ প্রথা—মানত করা,শিরনি দান,নির্দিষ্ট সময়ে মাজারে প্রার্থনা।
এছাড়া রয়েছে অগণিত অলৌকিক ঘটনার গল্প, যা স্থানীয়রা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শুনিয়ে আসছেন। এসব কিংবদন্তি কেবল কৌতূহলই নয়, বরং এক ধরনের রহস্যময় আভা যোগ করেছে প্রত্নস্থলটির পরিচয়ে।
যদি এখানে বৈজ্ঞানিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালানো হয়, তবে হয়তো উদঘাটিত হবে অজানা এক সভ্যতার চিহ্ন বা প্রাচীন মুসলিম বসতির তথ্য। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে—প্রাকৃতিক ক্ষয় ও মানুষের অবহেলায় হারিয়ে যেতে পারে এই অমূল্য নিদর্শন।
যে কোনো ইতিহাসপ্রেমী, প্রত্নতত্ত্ব-অনুরাগী বা সংস্কৃতিমনা ভ্রমণকারীর জন্য বীরনারায়ণপুরের তেরো আউলিয়ার ঢিবি একদিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ স্থান। এখানে এসে শুধু প্রত্নস্থল দেখা নয়, বরং অনুভব করা যায়। শতবর্ষ পুরনো বাতাসের গন্ধ,প্রাচীন ইটের উষ্ণতা,হারানো সময়ের নিঃশব্দ গল্প।
বীরনারায়ণপুরের তেরো আউলিয়ার ঢিবি কেবল একটি মাজার নয়—এটি ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, প্রত্নঐতিহ্য ও রহস্যের মিলনস্থল। এ স্থান সংরক্ষণ করা শুধু প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাজ নয়, বরং আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ একবার হারিয়ে গেলে, এই অতীত আর ফিরে আসবে না।


