প্রথম জীবনে ফুটবলের প্রতি অনুরাগ
১৯৩৯ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণার বারাসাত অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন ওয়াজেদ গাজী। তাঁর পিতার নাম ছিল সলেমান গাজী। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা ও আগ্রহ। দেশভাগের পর তিনি চলে আসেন যশোর শহরের খালধার রোডে, যেখান থেকে তাঁর ক্রীড়াজীবনের পথচলা শুরু হয় নতুন করে।
খেলোয়াড়ি জীবনের উত্থান ও সংগ্রাম
ওয়াজেদ গাজীর ফুটবল যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৭ সালে বারাসাত প্রথম বিভাগ লীগে। সেবছরই তিনি কলকাতা প্রথম বিভাগ লীগে “স্পোর্টিং ইউনিয়নের” পক্ষে মাঠে নামেন। তাঁর খেলা ও প্রতিভা অচিরেই নজরে পড়ে ক্রীড়ামহলের।
পরবর্তীতে তিনি খেলেন ১৯৬২-৬৩ মৌসুমে কলকাতা মোহামেডানের হয়ে, যা ছিল তাঁর জন্য এক বড় মাইলফলক। এরপর তাঁর পথচলা বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফুটবলে।
ঢাকা ও পূর্ব পাকিস্তানে ক্রীড়াযাত্রা
১৯৬৪-৬৫ মৌসুমে তিনি ঢাকা লীগে “বিজে প্রেস” দলের হয়ে খেলেন। এই সময়ে তিনি রাশিয়ান বাকুয়াইল টিমের বিরুদ্ধে ইস্ট পাকিস্তান টিমের পক্ষে খেলেন, এবং পাকিস্তান জাতীয় দলের ট্রায়েলে সুযোগ পান, যা ছিল তাঁর অসাধারণ ক্রীড়াশৈলীর প্রমাণ।
এরপর একে একে তিনি খেলেন ওয়াণ্ডারার্স ক্লাব (১৯৬৬), ইপিআইডিসি (১৯৬৭-১৯৭৩) এবং ঢাকা মোহামেডান (১৯৭৪-৭৫, ১৯৭৬) এর হয়ে। তিনি ছিলেন বহুবার লীগ চ্যাম্পিয়ন দলে। বিশেষ করে, ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি চারবার লীগ চ্যাম্পিয়ন হন, যা এক বিরল কৃতিত্ব।
দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান
১৯৭০ সালে নেপালের কাঠমাণ্ডুতে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ইস্ট পাকিস্তান দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি “প্রেসিডেন্ট একাদশ”-এর হয়ে “মুজিবনগর একাদশ” এর বিরুদ্ধে খেলেন — এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ফুটবল প্রতিযোগিতা।
১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত হন, এবং ১৯৭৪ সালে রাশিয়ার ডায়নামা মিস্কের বিরুদ্ধে খেলেন। যশোরে অনুষ্ঠিত ঐ খেলায় তিনি উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের সম্মিলিত টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন।
১৯৭৬ সালে জাতীয় ফুটবল লীগে যশোর জেলা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে চ্যাম্পিয়ন করেন — এটি ছিল তাঁর ক্যাপ্টেন হিসেবেও এক অসামান্য সাফল্য।
আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ
ওয়াজেদ গাজী ছিলেন সেই দুর্লভ খেলোয়াড়দের একজন, যিনি দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ করেন। তিনি খেলেছেন নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড সহ নানা দেশের মাঠে। ঢাকা মোহামেডানের হয়ে ডুরান্ট কাপে এবং আবাহনীর হয়ে আই এফ এ শীল্ড (১৯৭৪) ও ফরিদপুর গোল্ডকাপ (১৯৭২) এ অংশগ্রহণ করেন এবং চ্যাম্পিয়ন হন।
কোচিং ক্যারিয়ারে নতুন মাইলফলক
১৯৭৯ সাল থেকে ওয়াজেদ গাজী ফুটবল কোচিং শুরু করেন। তাঁর প্রথম দায়িত্ব ছিল “রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেণ্ডস সোসাইটি” (১৯৮০-৮৩)। এরপর আরামবাগ ক্রীড়া সংঘে (১৯৮৪-৮৫) কোচিং দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর কোচিং দক্ষতা এতটাই উন্নত ছিল যে, ১৯৯২ সালে “বাংলাদেশ আনসার” তাঁর প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৭ সালে ছিলেন জাতীয় দলের কোচ।
১৯৯৬ সালে সিকিমে “গভর্নরস্ গোল্ড কাপে” আরামবাগ টিম রানার্স আপ হয় তাঁরই কোচিংয়ে — এটি ছিল এক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের দলের বড় সাফল্য।
পুরস্কার ও সম্মাননা
ওয়াজেদ গাজীর অসামান্য ক্রীড়া অবদানের জন্য তাঁকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তিনি পেয়েছেন:
- ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি কর্তৃক সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার
- ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া সাংবাদিক সংস্থার শ্রেষ্ঠ কোচের পুরস্কার
- ১৯৮৬ সালে “চাঁদেরহাট”, যশোর জেলা শাখার শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব পুরস্কার
এই সব পুরস্কার তাঁর জীবনের অমূল্য স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গৌরবজনক অধ্যায়।
শেষ অধ্যায় ও প্রস্থানের বেদনাবিধুর মুহূর্ত
১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ওয়াজেদ গাজী পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে ক্রীড়া মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় বা কোচ ছিলেন না, ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি, যাঁর জীবন ক্রীড়ামোদীদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ।
উপসংহার : এক কিংবদন্তির উত্তরাধিকার
ওয়াজেদ গাজীর ক্রীড়াজীবন এক অনন্য ইতিহাস। তাঁর খেলোয়াড়ি দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, কোচিং প্রজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক মানের অবদান তাঁকে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য তিনি এক আলোকবর্তিকা। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে — ওয়াজেদ গাজী ছিলেন, আছেন, এবং থাকবেন এক কিংবদন্তি হিসেবেই।


