বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সভ্যতা গড়ে তোলার এক বিস্ময়কর অধ্যায়। উলুঘ খানজাহান ঠিক তেমনই একজন। তিনি ছিলেন একাধারে সাধক, যোদ্ধা, শাসক, নির্মাতা ও ধর্মপ্রচারক। ইতিহাসে তাঁকে খান-ই-আজম, উলুঘ খান-ই-জাহান নামেও চেনা যায়। দক্ষিণ বাংলার জনমানস ও স্থাপত্য ঐতিহ্যে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে, তাঁকে বাদ দিয়ে মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস কল্পনাই করা যায় না।
উলুঘ খানজাহান কি উজবেক ছিলেন?
উলুঘ খানজাহানের জাতিগত পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। তাঁর নামের আগে যুক্ত ‘উলুঘ’ শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তুর্কি ও মধ্য এশীয় পরিভাষায় ‘উলুঘ’ শব্দটি মর্যাদা ও বংশগত পরিচয়ের ইঙ্গিত বহন করে, যা অনেক গবেষকের মতে উজবেক বা তুর্কি-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত পরিচয়ের দিকে ইশারা করে। যদিও তাঁর জন্মস্থান বা পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য সমকালীন দলিল খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবুও ভাষাগত বিশ্লেষণ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং তাঁর সামরিক অবস্থান থেকে অনুমান করা হয়—উলুঘ খানজাহান সম্ভবত উজবেক বা মধ্য এশীয় তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিলেন।
খান-ই-আজম: বাংলার সুলতানের বিশ্বস্ত কর্মকর্তা
খান-ই-আজম ছিল উলুঘ খানজাহানের সরকারি উপাধি। এই উপাধি থেকেই বোঝা যায়, তিনি ছিলেন বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ প্রথমের (১৪৪২–১৪৫৯ খ্রি.) একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সুলতানি প্রশাসনে এই উপাধি অত্যন্ত সম্মানজনক এবং দায়িত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল দক্ষিণ বাংলার দুর্গম অঞ্চল শাসন ও বসতি স্থাপনের মতো কঠিন কাজ।
দিল্লি থেকে বাংলায় আগমন: এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে তৈমুরের আক্রমণের পর উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরমভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপটেই অনেক তুঘলক আমলের সেনাপতি ও প্রশাসক বাংলার দিকে অগ্রসর হন। ইতিহাসবিদদের মতে, উলুঘ খানজাহানও সেই সময় দিল্লি অঞ্চল ছেড়ে বাংলায় আগমন করেন। প্রথমে দিল্লির সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবে এবং পরে বাংলার সুলতানের অধীনে তিনি সুন্দরবনের দক্ষিণাঞ্চলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে মানববসতির সূচনা
পঞ্চদশ শতকে সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ছিল গভীর অরণ্যে ঢাকা, জনবসতিহীন ও ভয়ংকরভাবে দুর্গম। নদী, খাল, বন আর বন্যপ্রাণীতে পূর্ণ এই অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলা ছিল একপ্রকার অসম্ভব কাজ। কিন্তু উলুঘ খানজাহান এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেন। তিনি ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করে ধীরে ধীরে মানববসতির পথ খুলে দেন। তাঁর নেতৃত্বে সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে জ্বলে ওঠে সভ্যতার প্রদীপ।
খলিফাতাবাদ: একটি পরিকল্পিত নগরীর জন্ম
উলুঘ খানজাহান বাগেরহাট শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠে যে নগর গড়ে তোলেন, তা পরবর্তীকালে ‘খলিফাতাবাদ’ নামে পরিচিতি পায়। ঐতিহাসিক ও সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে অনেক পণ্ডিত মনে করেন, ষোড়শ শতকের দিকে এই নগরটি ছিল একটি সমৃদ্ধ রাজধানী নগরী। দক্ষিণে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৬ কিলোমিটার বিস্তৃত এই শহরে ছিল পরিকল্পিত রাস্তা, জলাশয়, মসজিদ, সমাধি ও প্রশাসনিক স্থাপনা।
ইসলাম প্রচার ও শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা
ইলিয়াস শাহী রাজবংশের শাসনামলে উলুঘ খানজাহান দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার এই অঞ্চল জয় করেন এবং এখানেই শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আগমনের পূর্বে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের কোনো স্থাপত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায় না। যদিও তিনি দিল্লির অধীন ছিলেন, তবুও কার্যত তিনি স্বাধীনভাবেই প্রশাসন পরিচালনা করতেন বলে ধারণা করা হয়। তবে তাঁর নিজের নামে কোনো মুদ্রা প্রচলন বা খুতবা জারির প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন
কালের বিবর্তনে অনেক স্থাপনা হারিয়ে গেলেও আজও বাগেরহাটে টিকে আছে উলুঘ খানজাহানের গড়া অমূল্য কিছু নিদর্শন। ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ, সিঙ্গাইর মসজিদ, বিবিবেগনী মসজিদ, রণবিজয়পুর মসজিদ, একগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান (রঃ) ও জিন্দাপীরের সমাধি, রেজাখোদা মসজিদ—এসব স্থাপনা শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্যচিন্তার জীবন্ত সাক্ষ্য।
জনকল্যাণমূলক কাজ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
উলুঘ খানজাহান কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, রাস্তা, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করেন। বৃহত্তর যশোর ও খুলনা অঞ্চলে অসংখ্য দীঘি খনন তাঁর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের উজ্জ্বল প্রমাণ। সমাধি সংলগ্ন ঠাকুরদীঘি এবং ষাটগম্বুজ মসজিদের পশ্চিমে অবস্থিত ঘোড়াদীঘি আজও তাঁর স্মৃতিবাহী নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রাচীন সড়ক ও জনপদের গোড়াপত্তন
জনশ্রুতি অনুযায়ী, উলুঘ খানজাহান বাগেরহাট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি দীর্ঘ মহাসড়ক নির্মাণ করেছিলেন। সামন্তসেনা থেকে বাদোখালী পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা এবং শুভড়ারা থেকে খুলনা দৌলতপুর পর্যন্ত প্রাচীন সড়কও তাঁর উদ্যোগে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। পাশাপাশি তিনি মুড়লী কসবা, পায়গ্রাম কসবা ও বারবাজারের মতো একাধিক জনপদের গোড়াপত্তন করেন, যা পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
খানজাহান স্থাপত্যশৈলী: একটি স্বতন্ত্র ধারা
উলুঘ খানজাহানের নির্মাণশৈলী বাংলার ইতিহাসে একটি আলাদা অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। তাঁর নামানুসারেই ‘খানজাহান স্থাপত্যশৈলী’ পরিচিতি পায়। ইটের গাঁথুনি, গম্বুজের ব্যবহার, শক্ত কাঠামো ও সহজ নকশা—এই শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। খুলনা, যশোর ও বরিশালের বিস্তৃত অঞ্চলে এই ধারার বহু নিদর্শন আজও দেখা যায়।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই সব ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে ‘ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট’ ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি শুধু বাগেরহাট নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য এক গর্বের বিষয়। উলুঘ খানজাহান প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদ দক্ষিণ বাংলায় সভ্যতার সূচনা, মানববসতির বিজয় এবং ধর্ম, সংস্কৃতি ও নির্মাণশিল্পের এক অনন্য সংমিশ্রণ হিসেবে আজও ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
শেষ কথা
উলুঘ খানজাহান ছিলেন শুধু একজন শাসক নন, তিনি ছিলেন সভ্যতা নির্মাণের কারিগর। উজবেক বা তুর্কি বংশোদ্ভূত পরিচয়ের সম্ভাবনা থাকলেও, তাঁর আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে দক্ষিণ বাংলার মাটি, ইট আর মানুষের ইতিহাসে। সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে তিনি যে সভ্যতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও বাগেরহাটের প্রতিটি ইটে, প্রতিটি গম্বুজে নীরবে কথা বলে।
লেখক:সাজেদ রহমান,সম্পাদক ও প্রকাশক,যশোর খবর।


