চেঙ্গিস খান: এক যাযাবর থেকে বিশ্বজয়ীর উত্থান
প্রায় আটশো বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক বিস্ময়কর চরিত্র। যিনি কৃষ্ণ সাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, মঙ্গোল যাযাবর নেতা তেমুজিন, যিনি ইতিহাসে পরিচিত চেঙ্গিস খান নামে।
১১৬২ সালে বৈকাল হ্রদের পূর্বে দুর্গম এক অঞ্চলে তার জন্ম। জন্মের সময় তার হাতের তালুতে রক্ত জমাট বাঁধা ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে ‘দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অব দ্য মঙ্গোলস’ গ্রন্থে। সেই ঘটনাকে অনেকেই ভবিষ্যতের এক মহাবিজেতার অশুভ-শুভ সংকেত হিসেবে দেখেছিলেন।
চেঙ্গিস খান ছিলেন মঙ্গোল, মুসলিম নন। ‘খান’ ছিল একটি সম্মানসূচক উপাধি। তিনি শামানিক ধর্মে বিশ্বাস করতেন, যেখানে প্রকৃতি ও মহাজাগতিক শক্তির প্রতি গভীর আস্থা রাখা হয়।
কষ্টের শৈশব ও নির্মম বাস্তবতা
চেঙ্গিস খানের শৈশব মোটেও সুখের ছিল না। শত্রুরা বিষ প্রয়োগ করে তার বাবাকে হত্যা করে। অল্প বয়সেই পরিবারসহ নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। অবহেলা, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই কেটেছে তার জীবনের প্রথম ভাগ।
এই কঠিন বাস্তবতা তাকে ধীরে ধীরে নির্মম করে তোলে। ১৩ বছর বয়সে নিজের সৎ ভাই বেহতেরকে হত্যা করেন তিনি। ইতিহাসবিদ ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকলিনের মতে, এই ঘটনা চেঙ্গিস খানের চরিত্রে থাকা নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়।
মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিস্ময়কর বিস্তার
পঞ্চাশ বছর বয়সের পর চেঙ্গিস খানের জয়ের গতি ইতিহাসে নজিরবিহীন হয়ে ওঠে। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মঙ্গোল সাম্রাজ্য চীন, মধ্য এশিয়া, ইরান, রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ বিশাল অঞ্চল শাসন করে।
ইতিহাসবিদ এফ. ই. ক্রাউস লিখেছেন, চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য ছিল প্রায় এক কোটি ২০ লাখ বর্গমাইল জুড়ে, যা আয়তনে আফ্রিকার সমান এবং উত্তর আমেরিকার চেয়েও বড়। রোমান সাম্রাজ্যও এর তুলনায় ছোট ছিল।
তার সেনাবাহিনী অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, জাপান ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এত বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে ছিল তার অসাধারণ সামরিক কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধনীতি।
নিষ্ঠুরতা ও নেতৃত্বের দ্বৈত রূপ
চেঙ্গিস খান ছিলেন একই সঙ্গে নির্মম ও কৌশলী। শহর দখলের পর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ছিল তার যুদ্ধনীতির অংশ। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু’—এই দুই বিকল্প দিয়ে শত্রুদের একটি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তার রাগ ছিল ভয়ংকর। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, একবার এক দোভাষী কূটনৈতিক ভাষা নরম করায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন চেঙ্গিস খান। আবার অন্যদিকে, কোনো কৃষকের কষ্ট দেখে তার সমস্ত কর মাফ করে দেওয়ার মতো উদারতাও দেখিয়েছেন তিনি।
ভারতের সীমান্তে এসে থমকে যাওয়া
इतিহাসের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এত বিশাল সাম্রাজ্য জয় করেও চেঙ্গিস খান কেন ভারত আক্রমণ করলেন না?
১২২১ সালে খাওয়ারিজম শাহ সাম্রাজ্যের শেষ শাসক জালাল আল-দিনকে ধাওয়া করতে করতে তিনি সিন্ধু নদীর তীরে পৌঁছান। এখানেই দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। পরাজয়ের মুখে জালাল আল-দিন সিন্ধু নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যান।
চেঙ্গিস খান চাইলেই ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই পথে এগোলেন না।
ভারতের তাপমাত্রা: এক অপ্রত্যাশিত বাধা
ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া ছিল মঙ্গোলদের জন্য এক বড় ধাক্কা। তারা শীতল ও শুষ্ক জলবায়ুতে অভ্যস্ত ছিল। সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চলের তীব্র গরমে সৈন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ড. আন্দ্রে উইঙ্ক লিখেছেন, ভারতের তাপমাত্রা চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনীর জন্য কার্যত অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
ঘোড়া ও পশুখাদ্যের সংকট
মঙ্গোল সেনাবাহিনীর শক্তির মূল ছিল তাদের ঘোড়া। হাজার হাজার ঘোড়ার জন্য বিপুল পশুখাদ্য ও পানির প্রয়োজন হতো। সিন্ধু অঞ্চলে পানির জোগান থাকলেও পর্যাপ্ত পশুখাদ্যের অভাব ছিল।
উচ্চমানের ঘোড়ার ঘাটতিও ছিল বড় সমস্যা। নতুন করে ঘোড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কূটনৈতিক বাস্তবতা ও ইলতুৎমিসের ভূমিকা
দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস অত্যন্ত কৌশলে পরিস্থিতি সামাল দেন। তিনি জালাল আল-দিনকে আশ্রয় দেননি, আবার চেঙ্গিস খানকেও সরাসরি উসকানি দেননি। ফলে চেঙ্গিস বুঝতে পারেন, ভারতে প্রবেশ করলে নতুন ও জটিল যুদ্ধে জড়াতে হতে পারে।
রোগ, অজানা ভূগোল ও কুসংস্কার
ভারতের বনাঞ্চল, পর্বতমালা ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে মঙ্গোলদের কাছে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। উপরন্তু, নতুন রোগে অনেক সৈন্য আক্রান্ত হয়।
চেঙ্গিস খান কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। যাত্রাপথে একটি গন্ডার দেখাকে তিনি অশুভ লক্ষণ হিসেবে নেন। এসব কারণ মিলিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত মঙ্গোলিয়ায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শেষ অধ্যায়: মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। মৃত্যুশয্যায় তিনি তার সন্তানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেন। তিনি জানতেন, সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে ভ্রাতৃবিরোধই হবে সবচেয়ে বড় শত্রু।
তার মৃত্যুর পর মঙ্গোল সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হলেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। তবুও ইতিহাসে চেঙ্গিস খান আজও রয়ে গেছেন এক অতুলনীয় সামরিক নেতা হিসেবে।
শেষ বার্তা
চেঙ্গিস খান ভারতের সীমান্ত থেকে ফিরে গিয়েছিলেন কোনো একক কারণে নয়। তীব্র তাপমাত্রা, ঘোড়া ও রসদের সংকট, রোগ, অজানা ভূগোল এবং কূটনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়েই তাকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল।
বিশ্বজয়ী হয়েও যে সব যুদ্ধ জেতা যায় না, চেঙ্গিস খানের ভারত অভিযান তারই এক অনন্য উদাহরণ।


