যশোরের ভৈরব নদ ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে আন্দোলনের নতুন ধাপ। দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল, দূষণ আর প্রশাসনিক অবহেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদী এবং তার আশপাশের পরিবেশ। এ বাস্তবতায় ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটি সম্প্রতি পাঁচ দফা দাবিতে মহাসড়কে অবস্থানসহ নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
মঙ্গলবার যশোরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটির নেতৃবৃন্দ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। লিখিত বক্তব্যে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু জানান, নদী বাঁচাতে এবং টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে তাদের পাঁচ দফা দাবি হলো—অবৈধ দখল উচ্ছেদ: ভৈরবসহ সব নদীকে দখলমুক্ত করতে হবে।দূষণ নিয়ন্ত্রণ: হাসপাতাল-ক্লিনিকের বর্জ্য ও গৃহস্থালি পয়োনিষ্কাশন বন্ধ করতে হবে। বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।নদী তট আইন বাস্তবায়ন: আইন মেনে নদীর সীমানা উদ্ধার করতে হবে।সেতু সংস্কার: সংকীর্ণ ও অস্থায়ী সেতু অপসারণ করে নৌ-চলাচলের উপযোগী অনুমোদিত সেতু নির্মাণ করতে হবে।ইকোপার্ক ঘোষণা: কচুয়া ইউনিয়নের ১১ কিলোমিটার নদী দখলমুক্ত করে ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনকারীরা কয়েকটি ধাপে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের নিকট স্মারকলিপি, ২৪ সেপ্টেম্বর এলজিইডি দপ্তরে স্মারকলিপি এবং অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে যশোর-ঢাকা মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।
নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ২৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব নদ খনন ও সংস্কার করা হলেও কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং দুর্নীতি আর পরিকল্পনার ঘাটতিতে নদীকে খালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। খননের মূল লক্ষ্য ছিল নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং নৌযান চলাচল নিশ্চিত করা। অথচ ৫৩টি সেতু নিয়ম মেনে পুনর্নির্মাণ না করায় পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে। নদী তট আইন লঙ্ঘন করে নদীর ভেতরে পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে, যা অবৈধ স্থাপনাগুলোকে বৈধতা দিচ্ছে। হাসপাতাল ও গৃহস্থালি বর্জ্যে নদীর পানি এখন দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে।
আন্দোলনকারীরা জানান, এলজিইডি নীতিমালা উপেক্ষা করে ছাতিয়ানতলা, দাইতলা ও রাজারহাট এলাকায় সংকীর্ণ সেতু নির্মাণ করেছে। এর ফলে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সেতুগুলো সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়নি।
নেতারা মনে করেন, মাথাভাঙা ও ভৈরব নদীর সংযোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এতে ভবদহসহ উপকূলীয় জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে। দর্শনা থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার সংযোগ স্থাপন করা গেলে পদ্মা-মাথাভাঙা-ভৈরব নদীর নতুন জলপথ গড়ে উঠবে।
আন্দোলনকারীরা আরও জানান, মুক্তেশ্বরী নদীর জমি দখল করে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। এমনকি নদী ভরাট করে হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে, যা সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনার পরিপন্থী।
যশোর সদরের কচুয়া ইউনিয়নের কৈখালী এলাকায় ভৈরব নদীর প্রায় ১১ কিলোমিটার অংশ অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
ভৈরব নদ শুধু যশোরের প্রাণই নয়, এ নদী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দখল, দূষণ আর অব্যবস্থাপনার কারণে এ নদী আজ সংকটে। আন্দোলনকারীরা সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন—দ্রুত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, নদী উদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভৈরবকে টিকিয়ে রাখুন।


