যশোরের মনিরামপুরে পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো এবং শিশুদের গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহিত করতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ঐক্য-বন্ধন’। “আমাদের প্লাস্টিক দিন, পরিবেশ বন্ধু গাছ ও চকলেট নিন” স্লোগানে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে তার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা।
বুধবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে মনিরামপুর উপজেলার পলাশী রাজবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী আয়োজনটি ইতিমধ্যেই সবার দৃষ্টি কাড়ছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ঐক্য-বন্ধন’ দীর্ঘদিন ধরে প্লাস্টিক বর্জ্য মোকাবিলা ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। টিফিনের টাকায় পরিচালিত এই সংগঠন এবার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
আয়োজকরা জানান, বাজারে প্লাস্টিকের বোতল ও মোড়কের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। বাসা-বাড়ির আশপাশে জমে থাকা এসব বর্জ্য পরিষ্কার করতে শিশুদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে উঠছে।
এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে পুরোনো ও পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে স্কুলে নিয়ে এসেছে। বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ফলজ, বনজ ও ঔষধি ২০০টি বিভিন্ন প্রজাতির চারা।
প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে গাছ দেওয়ার এই ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অনেক শিশু প্রথমবারের মতো নিজ হাতে গাছ রোপণের সুযোগ পেয়ে দারুণ উৎসাহিত হয়েছে।
পলাশী রাজবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভি হোসেন বলেন,“আমরা বইয়ে পড়েছি গাছ লাগানো উচিত। কিন্তু আগে কখনও নিজ হাতে গাছ লাগাইনি। এখন নিজেই গাছ লাগাবো এবং তার যত্ন নেব।”
এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলছে এবং পরিবেশবান্ধব আচরণের প্রতি সচেতন করে তুলছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আফরোজা পারভীন বলেন, “ঐক্য-বন্ধন যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। এমন আয়োজন সচরাচর দেখা যায় না। আমরা তাদের সাফল্য কামনা করি।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও সংগঠনটির এই পরিবেশবান্ধব কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, এমন আয়োজন শিশুদের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা বাড়াবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে পরিবেশ সচেতন করে তুলবে।
ঐক্য-বন্ধন-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হাসান জানান: “বাজারের নানা পণ্য ব্যবহারের ফলে আমাদের আশপাশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। আমরা চেয়েছি শিশুরা সেই বর্জ্য সংগ্রহ করে আমাদের কাছে জমা দিক, আর বিনিময়ে তারা পাবে গাছ। এতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ রক্ষায় অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাইলে বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ করতে পারতাম। কিন্তু প্লাস্টিক সংগ্রহের বিনিময়ে চারা দেওয়ার মাধ্যমে শিশুদের গাছ লাগানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সচেতন করে তোলা হচ্ছে।”
আয়োজকরা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র একটি বিদ্যালয়েই নয়, বরং ধীরে ধীরে জেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভবিষ্যতে এই কর্মসূচি প্রসারিত করে আরও বেশি শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাদের লক্ষ্য, “প্রতিটি শিশুর হাতে একটি গাছ, প্রতিটি স্কুলে সবুজের ছায়া” স্লোগান বাস্তবায়ন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা।
এই ব্যতিক্রমী আয়োজন শিশুদের শুধু গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে দিচ্ছে না, বরং তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করে এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলছে।
যদি এমন উদ্যোগ দেশের প্রতিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চালু হয়, তবে একদিকে পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে প্রজন্ম হবে সবুজ ও স্বাস্থ্যকর।


