যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় পোষা বিড়ালের উপর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রান্না করা মাংসের পাত্রে মুখ দেওয়ার অভিযোগে দুটি নিরীহ পোষা বিড়ালকে নির্মমভাবে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনা সামনে এসেছে। এই ঘটনার জেরে একটি বিড়ালের মৃত্যু হয়েছে, অন্যটি এখনও মারাত্মকভাবে আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ভুক্তভোগী বিড়ালের মালিক প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করায় বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
মনিরামপুরে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনা
ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার দুপুরে মনিরামপুর উপজেলার চালকিডাঙ্গা বাজার এলাকায়। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা হুসাইন কবির হিরা তার প্রতিবেশীর দুটি পোষা বিড়ালকে বাড়ির ভেতরে আটকে রেখে নির্মমভাবে মারধর করেন। প্রত্যক্ষভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়া বিড়াল দুটি গুরুতর আহত হয়। আহত অবস্থায় একটি বিড়াল কোনোমতে বাড়ি ফিরে এলেও অপরটি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিল।
পরদিন শনিবার আহত বিড়াল দুটিকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নেওয়া হলে একটি বিড়াল মারা যায়। অন্য বিড়ালটির কয়েকটি দাঁত ভেঙে গেছে এবং ডান চোখে গুরুতর রক্তাক্ত জখম রয়েছে। এই ঘটনা প্রাণীপ্রেমীদের মনে গভীর দাগ কেটেছে।
বিড়ালের মালিকের অভিযোগের বিস্তারিত
বিড়াল দুটির মালিক জিল্লুর রহমান পেশায় একজন মোবাইলফোন ব্যবসায়ী। লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি অত্যন্ত যত্নে দুটি বিড়াল পুষে আসছেন। শুক্রবার দুপুরে বিড়াল দুটি ভুলবশত প্রতিবেশী হিরার বাড়িতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে তারা ঘরের ভেতরে রান্না করা খাবারের কাছে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
জিল্লুর রহমানের ভাষ্যমতে, হুসাইন কবির হিরা বিড়াল দুটিকে ঘরের ভেতর আটকে রেখে লাঠি ও হাত দিয়ে মারধর করেন। মারধরের একপর্যায়ে একটি বিড়ালকে মৃত ভেবে দরজা খুলে দিলে সেটি কোনোরকমে পালিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। পরে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আহত বিড়ালের অবস্থা ও মৃত্যুর ঘটনা
অন্য বিড়ালটিকে না পেয়ে মালিক দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করেন। পরে সেটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বিড়ালটির মুখে ও চোখে মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল। কয়েকটি দাঁত সম্পূর্ণ ভেঙে যায় এবং ডান চোখে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়।
শনিবার প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা একটি বিড়ালকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সেটি মারা যায়। এই মৃত্যু স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং অনেকেই এটিকে নির্মম পশু নির্যাতনের জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
প্রশাসনের কাছে অভিযোগ ও আশ্বাস
ঘটনার পর জিল্লুর রহমান মনিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি জানান, ছুটির দিন থাকায় প্রথমে প্রাণিসম্পদ দপ্তর বন্ধ পাওয়া যায়। পরে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন।
থানা ও উপজেলা প্রশাসন অভিযোগ গ্রহণ করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ঘটনার সত্যতা যাচাই করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্তের বক্তব্য ও পাল্টা দাবি
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হুসাইন কবির হিরা ভিন্ন কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, প্রতিবেশীর বিড়াল প্রায়ই তার বাড়িতে এসে উৎপাত করে। শুক্রবার একটি বিড়াল রান্না করা মাংস খাওয়ায় তিনি রাগের মাথায় কয়েকটি আঘাত করেছেন। তবে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিড়ালটিকে তিনি মারেননি এবং সেটি তার বাড়িতেও আসেনি।
এই বক্তব্যের সঙ্গে অভিযোগকারীর বক্তব্যের স্পষ্ট অমিল থাকায় বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি উঠেছে।
আইন ও পশু নির্যাতন বিষয়ে সচেতনতার প্রশ্ন
এই ঘটনা আবারও পশু নির্যাতন বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছে। পোষা প্রাণী মানুষের পরিবারের অংশ। তাদের উপর এমন নির্মম আচরণ শুধু অমানবিক নয়, আইনত দণ্ডনীয় অপরাধও বটে।
প্রাণী কল্যাণ আইন অনুযায়ী, কোনো প্রাণীকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা বা হত্যা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও মানবিক দিক
এলাকাবাসীর অনেকেই এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের মতে, একটি নিরীহ প্রাণী খাবারের দিকে মুখ বাড়িয়েছে বলেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অনেকেই প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ কামনা করছেন।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু মানুষের প্রতি নয়, প্রাণীদের প্রতিও মানবিক হওয়া। একটু ধৈর্য আর সহানুভূতি থাকলে হয়তো এমন মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম হতো না।
মনিরামপুরের এই পোষা বিড়াল নির্যাতনের ঘটনা সমাজে মানবিকতা, আইন প্রয়োগ এবং পশু অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসনের সঠিক তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মাঝেও প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত হওয়া জরুরি।
একটি নিরীহ প্রাণীর মৃত্যু যেন শুধু একটি খবর হয়ে না থাকে, বরং এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।


