রমযান এলেই সারাদিন রোজা রেখে ইফতারের আগে এক গ্লাস ঠান্ডা পানির তৃষ্ণা কেমন লাগে—এটা রোজাদার মাত্রই বোঝেন। ঠিক সেই প্রয়োজনকে সামনে রেখে যশোর শহরের খড়কী এলাকায় আবারও শুরু হয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থার মানবিক উদ্যোগ “আইডিয়া বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি প্রকল্প”। টানা আট বছরের সফল ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবার নবমবারের মতো রমযানজুড়ে চলছে এই সেবামূলক কার্যক্রম, যা স্থানীয় মানুষের মাঝে ইতোমধ্যে ব্যাপক স্বস্তি এনে দিয়েছে।
২০১৯ সাল থেকে আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থা নিয়মিতভাবে যশোরের খড়কী এলাকায় রোজাদারদের জন্য বিশুদ্ধ বরফ-শীতল পানি সরবরাহ করে আসছে। এবারের আয়োজনও শুরু হয়েছে প্রথম রমযান থেকেই। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, বৃহস্পতিবার আঞ্জুমানে খালেকিয়া এতিমখানার সামনে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খড়কী মসজিদের ইমাম, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হামিদুল হক শাহীন। শুরুতেই রোজাদারদের মাঝে বিশুদ্ধ ঠান্ডা শরবত বিতরণ করে কার্যক্রমের শুভ সূচনা করা হয়, যা উপস্থিত মানুষের মাঝে বাড়তি আনন্দ যোগ করে।
প্রতিষ্ঠাতা হামিদুল হক শাহীন জানান, রমযান মাসে আইডিয়ার বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মসূচির মধ্যে এই বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি প্রকল্প অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, শুধু দায়িত্ববোধ থেকেই নয়, এলাকার মানুষের প্রয়োজন বুঝেই স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিদিন এই কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালে ছোট পরিসরে শুরু হলেও এখন অনেক মানুষ প্রতিদিন এই পানির জন্য অপেক্ষা করেন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার, মেসে থাকা শিক্ষার্থী, ছোট দোকানদার এবং দিনমজুরদের জন্য এটি যেন স্বস্তির এক নির্ভরযোগ্য উৎস হয়ে উঠেছে। মানুষের মুখের তৃপ্তিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রকল্পের অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিদিন ইফতারের ঠিক আগে নির্ধারিত রুটে পানি বিতরণ করেন। আইডিয়া পিঠা পার্ক এলাকা থেকে শুরু করে খড়কী পীর বাড়ি হয়ে জেবিন মোড় পর্যন্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই ঠান্ডা পানি পৌঁছে দেওয়া হয়।
এই পরিকল্পিত ব্যবস্থার কারণে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সহজেই বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি পেয়ে থাকেন। সময়মতো উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবীরা দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে পানি বিতরণ করেন, যাতে ভিড় হলেও কেউ বঞ্চিত না হন।
প্রকল্পের সমন্বয়ক মো. মেহেদী হাসান জানান, গত পাঁচ বছর স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে মানুষের পানির প্রয়োজন দেখেছেন। তাঁর কথায়, সারাদিন রোজা রেখে নিজের তেষ্টা ভুলে অন্যের তেষ্টা মেটাতে পারার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, ছোট শিশু থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ—সবাই যখন এক গ্লাস ঠান্ডা পানি হাতে পেয়ে হাসিমুখে দোয়া করেন, তখন সব কষ্ট সার্থক মনে হয়। এই মানবিক অনুভূতিই স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতিদিন নতুন করে কাজ করার প্রেরণা দেয়।
স্বেচ্ছাসেবীরা জানান, সাবমারসিবল পাম্পের মাধ্যমে উত্তোলিত বিশুদ্ধ পানি প্রথমে সংরক্ষণ করা হয়। পরে বরফ দিয়ে সেটি শীতল করে প্রতিদিন নির্ধারিত স্পটে সরবরাহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সম্পন্ন করা হয়, যাতে পানির মান বজায় থাকে।
শুধু পানি নয়, মাঝে মাঝে আকস্মিকভাবে ঠান্ডা শরবতও বিতরণ করা হয়। এই চমকপ্রদ আয়োজন রোজাদারদের মাঝে বাড়তি আনন্দ সৃষ্টি করে এবং উদ্যোগটির প্রতি মানুষের ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দেয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রকল্পের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের দায়িত্ব প্রতিবছর আইডিয়া সমাজকল্যাণ সংস্থাই বহন করে থাকে।
এলাকার বাসিন্দা নাসিম বলেন, তাদের বাসায় ফ্রিজ না থাকায় ইফতারের সময় ঠান্ডা পানি পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। আইডিয়ার এই উদ্যোগ তাদের সেই দুশ্চিন্তা দূর করেছে। এখন প্রতিদিন ইফতারের আগে তারা এই পানির জন্য অপেক্ষা করেন।
এম এম কলেজের শিক্ষার্থী আমেনা জানান, মেসে থাকার কারণে রোজার সময় এই পানিই তাদের প্রধান ভরসা। তিনি বলেন, তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এসে অপেক্ষা করেন।
একজন রিকশাচালক আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, সারাদিন রিকশা চালানোর পর ইফতারের আগে এখানে এসে দাঁড়ান তিনি। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পেলেই শরীরটা যেন জুড়িয়ে যায়। কখনো শরবত পেলে সেটি তাদের জন্য বাড়তি পাওয়া।
ক্রমেই “আইডিয়া বিশুদ্ধ ঠান্ডা পানি প্রকল্প” শুধু একটি পানি বিতরণ কর্মসূচি নয়, বরং রমযানের মানবিক চেতনা ও সামাজিক সংহতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠছে। প্রতিবছর এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে আরও গভীর জায়গা করে নিচ্ছে।
যেখানে অনেকেই ব্যস্ত নিজের কাজ নিয়ে, সেখানে একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবক প্রতিদিন মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকছে—এটাই আসলে সমাজের জন্য বড় আশা জাগানিয়া ছবি। ছোট একটি উদ্যোগ কীভাবে বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে, খড়কীর এই কার্যক্রম তারই জীবন্ত প্রমাণ।
রমযানজুড়ে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও যেন এই মানবিক উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে চলতে থাকে এবং আরও বেশি মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারে।



