যশোর রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে গেছে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো দলিলপত্র, যার মধ্যে ছিল ভলিউম বুক, বালাম বই, সূচিপত্র, টিপবইসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নথি। এই অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে ইতোমধ্যেই রহস্য ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ ভবনটি ছিল বিদ্যুৎবিহীন এবং তালাবদ্ধ।
আকস্মিক আগুনে আতঙ্ক
বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে যশোর রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবন থেকে আগুনের লেলিহান শিখা উঠতে দেখা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের ভেতরে সংরক্ষিত পুরনো কাগজপত্রে। স্থানীয়দের চোখে পড়লে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়।
ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। কারণ এই ভবনটি শুধু একটি অফিস ভবন নয়, এটি ছিল যশোর ও আশপাশের এলাকার শত বছরের জমি ও সম্পত্তির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার।
১৭৪১ সাল থেকে সংরক্ষিত দলিল
ঘটনাস্থলে উপস্থিত শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার শামসুজ্জামান মিলন জানান, এই রেকর্ড রুমে ১৭৪১ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত যশোর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার দলিলপত্র সংরক্ষিত ছিল। তিনি একসময় যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত ছিলেন এবং এসব নথির গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন।
তার ভাষায়, খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া এই ভবনের দরজা খোলা হতো না। আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ভেতরে ঢুকে যা দেখেছেন, তা ছিল হৃদয়বিদারক। প্রায় সব পুরনো কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। যেগুলো আগুনে পুরোপুরি পোড়েনি, সেগুলো আবার পানি দিয়ে আগুন নেভানোর সময় নষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিস্তারিত পরিদর্শনের পর বলতে পারবেন।
তালাবদ্ধ ভবন, নিখোঁজ নৈশপ্রহরী
যশোর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি সোহরাব হোসেনও আগুন লাগার সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তিনি জানান, পুরনো ভবনের গেটে তালা দেওয়া ছিল। সেখানে একজন নৈশপ্রহরী থাকার কথা থাকলেও আগুন লাগার সময় তাকে পাওয়া যায়নি।
তার মতে, বিষয়টি অত্যন্ত সন্দেহজনক। বাইরে থেকে আগুন জ্বলতে দেখা যাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, কী পরিমাণ দলিল পুড়েছে এবং এর প্রভাব কতটা গভীর, তা ভালোভাবে তদন্ত না করে বলা সম্ভব নয়।
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য
যশোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার ফিরোজ আহমেদ জানান, খবর পেয়ে তাদের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের গেটে তালা দেওয়া এবং ভেতরে আগুন জ্বলছে। কোনো স্টাফ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
তারা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং প্রায় ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তিনি বলেন, ভবনের দুটি কক্ষে রাখা পুরনো দলিল ও কাগজপত্র পুড়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্তের পর নির্ধারণ করা হবে।
বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও আগুন কীভাবে লাগলো—এমন প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিদ্যুৎবিহীন ভবনে আগুন: রহস্য ঘনীভূত
রেজিস্ট্রি অফিসের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পুরনো ভবনটিতে কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না। ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
এই তথ্য সামনে আসার পর আগুনের ঘটনাটি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবেই ভবনের ভেতরে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। কারণ এখানে সংরক্ষিত দলিলগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বহু জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলার সঙ্গে জড়িত।
ইতিহাসের অপূরণীয় ক্ষতি
এই অগ্নিকাণ্ডে শুধু কাগজপত্র নয়, পুড়ে গেছে যশোর অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাস। বহু পরিবার, জমিদারি, সম্পত্তি বণ্টন ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত তথ্য ছিল এই দলিলগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রেই এই পুরনো দলিল ছিল চূড়ান্ত প্রমাণ।
আইনজীবী ও দলিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই নথিগুলোর বিকল্প নেই। এগুলো হারিয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তদন্তের দাবি জোরালো
ঘটনার পরপরই স্থানীয় সচেতন মহল ও দলিল সংশ্লিষ্টরা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি যদি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা জরুরি।
একটি বিদ্যুৎবিহীন, তালাবদ্ধ ভবনে কীভাবে আগুন লাগে—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সন্দেহ থেকেই যাবে। নৈশপ্রহরীর অনুপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণের জায়গায় নিরাপত্তার ঘাটতি—সব মিলিয়ে ঘটনাটি সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মানতে নারাজ অনেকেই।
প্রশাসনের করণীয় কী
এই ঘটনার পর প্রশাসনের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। এত গুরুত্বপূর্ণ নথি কীভাবে অরক্ষিত অবস্থায় রাখা হলো? কেন ডিজিটাল সংরক্ষণের ব্যবস্থা আগে নেওয়া হয়নি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত দেশের সব পুরনো দলিল ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তর করা জরুরি। না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।
শেষ কথা
যশোর রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবনের অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি। দুইশ বছরের দলিল পুড়ে যাওয়ার অর্থ শুধু কাগজ হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া এক শতাব্দীর সাক্ষ্য।
এই আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। না হলে এমন রহস্যজনক ঘটনা ভবিষ্যতেও দেশের মূল্যবান ইতিহাসকে গ্রাস করতে পারে।


