ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন আসন পুনর্গঠন নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ায় যশোরের দুটি সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তনের উদ্যোগে স্থানীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যশোর-৩ (সদর) এবং যশোর-৬ (কেশবপুর) আসন ঘিরে চলমান বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট থেকে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে আসন পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত শুনানি শুরু হবে। এ শুনানিতে এক হাজার ৭৬০টি দাবি ও আপত্তি নিয়ে আলোচনা হবে। যশোরের দুটি আসনের বিষয়টিও তালিকায় রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, শুনানির পর যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যশোরে সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তনের প্রতিবাদে জেলা বিএনপি বিক্ষোভ মিছিল ও নির্বাচন অফিস ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে। যশোর-৩ ও যশোর-৬ আসনের সীমা পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে ‘অপচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে নেতাকর্মীরা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন এবং নির্বাচন অফিস ঘেরাও করে স্লোগান দেন। পরে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। একই দিন প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির সভাপতি সুকৃতি কুমার মণ্ডল যশোর-৬ আসনের সীমানা পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করেছেন। তিনি প্রস্তাব করেন, অভয়নগর উপজেলা, মনিরামপুরের ছয়টি ইউনিয়ন (ঢাকুরিয়া, হরিদাসকাটি, কুলটিয়া, দুর্বাডাঙ্গা, নেহালপুর ও মনোহরপুর),এবং কেশবপুরের তিনটি ইউনিয়ন (সুফলাকাটি, পাঁজিয়া ও গৌরিঘোনা) এই আসনে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
তার দাবি, নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চল ও ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণে এ অঞ্চল উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। তিনটি ভিন্ন আসনে বিভক্ত থাকার কারণে কোনো সমন্বিত উন্নয়ন হয়নি। ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে যশোর-৬ আসনে যুক্ত করলে সমস্যা সমাধান সহজ হবে।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভয়নগর ও কেশবপুর নিয়ে যশোর-৬ আসন ছিল। একই সময়ে বাঘারপাড়া ও সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছিল যশোর-৪ আসন। তাই সীমানা পুনর্গঠনের ইতিহাস নতুন নয়।
তবে নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে যশোর-৩ আসনের পাঁচটি ইউনিয়ন কেটে যাবে, যা স্থানীয়দের কাছে অগ্রহণযোগ্য। এজন্য রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু অভিযোগ করেন, এই আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত করার ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে। ঠিক এমন সময়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে সীমানা পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
বিএনপি নেতারা জানান, স্বাধীনতার পর থেকে যশোরে ছয়টি আসনের ভিত্তিতেই নির্বাচন হয়েছে। শুধু ২০০৮ সালের সামরিক সমর্থিত সরকারের সময় একবার ব্যতিক্রম ঘটেছিল। এখন আবার একইভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়রা বলছেন, সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন নেই। বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে আসনগুলো বজায় রাখা উচিত। অনেকের মতে, এ পরিবর্তনের ফলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য নির্বাচনকাল সম্পর্কে জাতির সামনে স্পষ্ট করেছেন। নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।


