বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিতে গ্রাম আদালতের গুরুত্ব অপরিসীম। এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও জনমুখী করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এর অর্থায়নে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়িত বাংলাদেশে গ্রাম সক্রিয়করণ তৃতীয় পর্যায় প্রকল্প নতুন মাত্রা এনেছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে যশোর জেলার ৯৩টি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত সক্রিয় করতে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সাধারণ জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করেছে।
প্রশিক্ষণভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম
গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে সুসংগঠিত ও কার্যকর করতে নিচের প্রশিক্ষণগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে:
- ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ৪ দিনের গ্রাম আদালত বিষয়ক প্রশিক্ষণ
- উপজেলা রিসোর্স টিমের সদস্যদের ২ দিনের প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ (ToT)
- ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের ২ দিনের গ্রাম আদালত বিষয়ক প্রশিক্ষণ
এই প্রশিক্ষণগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের আইনি সচেতনতা, নিয়মিত মামলা ব্যবস্থাপনা, রেফারেল সিস্টেমে দক্ষতা, এবং গ্রাম আদালতের কাগজপত্র রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে সক্ষমতা অর্জন হয়েছে।
সমন্বয় সভা ও তদারকির শক্তিশালী কাঠামো
প্রকল্পে একটি সুসংহত সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে:
- উপজেলা পর্যায়ে দ্বি–মাসিক অগ্রগতি সমন্বয় সভা
- জেলা পর্যায়ে অর্ধবার্ষিক সমন্বয় সভা
- উপজেলা সমন্বয়কারী ও জেলা ব্যবস্থাপক দ্বারা নিয়মিত মনিটরিং ও ফলো–আপ
- গ্রাম আদালত কার্যক্রমে ইউনিয়ন পরিষদকে সার্বিক সহায়তা প্রদান
এই কাঠামোর মাধ্যমে প্রত্যেক ইউনিয়নের গ্রাম আদালত কার্যক্রম স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়েছে, এবং বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমে এসেছে।
সচেতনতামূলক উদ্যোগ: জনগণের কাছে গ্রাম আদালতের বার্তা পৌঁছানো
প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন:
- গ্রাম আদালত বিষয়ক লিফলেট, ব্যানার, পোস্টার বিতরণ
- জনসমাগমে গ্রাম আদালত বিষয়ক আলোচনা সভা
- ইমাম, শিক্ষক, ইউপি সদস্য ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে সম্পৃক্ত করে গ্রাম আদালতের প্রচার
- কমিউনিটি সভায় সফল কেস স্টাডি উপস্থাপন
ফলে, সাধারণ জনগণ গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন হয়েছে এবং নিজের সমস্যা নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে।
মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান: সময়োপযোগী এবং জনবান্ধব বিচার
২০২৪-২৫ অর্থবছরে যশোর জেলার ৯৩টি ইউনিয়ন গ্রাম আদালতে মোট ২৫১১টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে:
- ২১৬৯টি মামলা সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে দায়ের
- ৩৪২টি মামলা জেলা আদালত হতে রেফার করা হয়েছে
- ফৌজদারি মামলা: ১২৭০টি
- দেওয়ানি মামলা: ১২৪১টি
পুরুষ আবেদনকারী ছিলেন ১৬৯৭ জন (৬৭.৫৮%) এবং নারী আবেদনকারী ৮১৪ জন (৩২.৪২%)।
মোট নিষ্পত্তিকৃত মামলা ২৪৭৭টি, অর্থাৎ ৯৮.৬৫% নিষ্পত্তি হার, যা স্থানীয় আদালতের সক্ষমতার প্রমাণ। গড়ে ২৩ দিনে একেকটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ আদায়: ন্যায়ের বাস্তবিক প্রতিফলন
এই প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ক্ষতিপূরণ আদায় হয়েছে ৩,০২,৪৩,৫৫০/- টাকা (তিন কোটি দুই লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার পাঁচশত পঞ্চাশ), যা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে সরাসরি প্রদান করা হয়েছে। এটি গ্রাম আদালতের বিচারিক কার্যকারিতা ও সামাজিক প্রভাবের প্রমাণ।

নারীর অংশগ্রহণ ও ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার
যদিও আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর হার তুলনামূলকভাবে কম (৩২.৪২%), তবুও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। প্রকল্পের নারী সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ফলে নারীরা এখন নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রাম আদালতে অভিযোগ জানাচ্ছেন।
প্রযুক্তিনির্ভর ডকুমেন্টেশন ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা
গ্রাম আদালতের সব মামলার নথিপত্র ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ, মামলা রেজিস্ট্রার হালনাগাদ করা, অভিযোগকারীর ফলো-আপ নোট রাখা ইত্যাদি কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় করা হয়েছে। এতে করে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা সহজতর হয়েছে।
গ্রাম আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচারে নতুন দিগন্ত
গ্রাম আদালত ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ও সক্রিয়করণ প্রকল্প যশোর জেলার ৯৩টি ইউনিয়নে বিচারিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে শুধু মামলা নিষ্পত্তিই নয়, বরং ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ, সামাজিক সহমর্মিতা ও আইনগত সচেতনতা বেড়েছে।
এই প্রকল্প মডেল হিসেবে দেশের অন্যান্য জেলায়ও প্রতিষ্ঠিত করা যেতে পারে, যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ এবং সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়।


