যশোরে আবারও প্রকাশ্যে এলো সরকারি দপ্তরে ঘুসের ভয়াবহ চিত্র। একজন শিক্ষক তাঁর মৃত স্ত্রী의 পেনশন পাওয়ার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন মাসের পর মাস। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাধ্য করা হয় ঘুস দিতে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে ধরা পড়লেন যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম। এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
যশোরে দুদকের অভিযানে হাতেনাতে গ্রেফতার
বুধবার সন্ধ্যায় যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পেনশন ফাইল অনুমোদনের বিনিময়ে সোয়া এক লাখ টাকা ঘুস গ্রহণের সময় মো. আশরাফুল আলমকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুদক যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আল-আমিন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ যাচাই ও পরিকল্পনার পর এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানের সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে ঘুসের পুরো টাকাই উদ্ধার করা হয়।
মৃত শিক্ষকের পেনশন ফাইল ঘিরে ঘুস দাবি
ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে। যশোরের বসুন্দিয়া খানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. নুরমুন্নবী জানান, তাঁর স্ত্রী শিরিনা আক্তার ঝিকরগাছার কাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ২৩ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী পেনশন ও আনুষঙ্গিক সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটি সহজ হয়নি। নুরমুন্নবীর অভিযোগ, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম পেনশন ফাইল অনুমোদনের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুস দাবি করেন।
এখানেই শেষ নয়। একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে। নুরমুন্নবীর এক বন্ধুর পেনশন ফাইল নিয়েও ঘুস দাবি করা হয় বলে জানান তিনি। এতে স্পষ্ট হয়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি নিয়মিত অনৈতিক প্রক্রিয়া।
বাধ্য হয়ে দুদকের দ্বারস্থ হন ভুক্তভোগী শিক্ষক
একজন শিক্ষক হিসেবে নুরমুন্নবীর পক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা জোগাড় করা সহজ ছিল না। তবুও স্ত্রীর ন্যায্য পেনশন পাওয়ার আশায় তিনি টাকা সংগ্রহ করেন। কিন্তু ঘুস দেওয়ার আগে তিনি একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বিষয়টি জানিয়ে দেন দুর্নীতি দমন কমিশনের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে। দুদক তাঁর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করে।
প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের পর একটি বিশেষ টিম পুরো ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং ফাঁদ পাতে।
পরিকল্পিত অভিযানে ঘুস গ্রহণের মুহূর্তেই ধরা
বুধবার বিকেলে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে যান নুরমুন্নবী। তিনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার হাতে ঘুসের টাকা তুলে দেন। ঠিক তখনই দুদকের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে মো. আশরাফুল আলমকে হাতেনাতে আটক করেন।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের সময় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটি আইনানুগভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং আলামত হিসেবে ঘুসের টাকা জব্দ করা হয়েছে।
দুদকের মামলা ও আইনগত প্রক্রিয়া
দুদক যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আল-আমিন জানান, এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আটক কর্মকর্তাকে থানায় সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
সরকারি দপ্তরে ঘুস সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র
এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সাধারণ মানুষ কীভাবে সরকারি সেবার জন্য হেনস্তার শিকার হন। একজন মৃত শিক্ষকের পেনশন, যা তাঁর পরিবারের ন্যায্য অধিকার, সেটির জন্যও ঘুস দাবি করা হয়—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিশেষ করে শিক্ষা প্রশাসনের মতো একটি সংবেদনশীল খাতে এ ধরনের দুর্নীতি সমাজে নেতিবাচক বার্তা দেয়। শিক্ষকরা যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার দায়িত্বে, সেখানে তাঁদের পরিবারকেই যদি ন্যায়বিচারের জন্য ঘুস দিতে হয়, তাহলে সেটি পুরো ব্যবস্থার ওপর আঘাত।
জনমনে প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর যশোরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
অনেকে আবার বলছেন, শুধু একজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করলেই হবে না। পুরো ব্যবস্থার ভেতরে কোথায় কোথায় দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে, সেটি খুঁজে বের করা জরুরি।


