বেনাপোল চেকপোস্টে আবারও আলোচনায় বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ঘটনা। ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার সময় বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রাসহ এক বাংলাদেশি পাসপোর্ট যাত্রীকে আটক করেছে বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমস। এই ঘটনায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অর্থ পাচার, যাত্রী ব্যাগেজ ব্যবহার করে মুদ্রা বহন এবং আন্তঃদেশীয় চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে বেনাপোল চেকপোস্টের ব্যাগেজ পরীক্ষণ কেন্দ্রে নিয়মিত স্ক্যানিং কার্যক্রম চলাকালে সন্দেহজনক একটি লাগেজ কাস্টমস কর্মকর্তাদের নজরে আসে। স্ক্যানিং শেষে হাতে-কলমে তল্লাশি চালানো হলে ওই লাগেজের ভেতর থেকে বিশেষভাবে লুকানো বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলেই আটক করা হয় যাত্রীকে।
বেনাপোল চেকপোস্টে আটক যাত্রীর পরিচয়
আটক ব্যক্তির নাম আব্দুল সালাম। বয়স ৪৭ বছর। তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর থানার কাটাখালী এলাকার র্যাংচাহাওলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতা আব্দুল সামাদ ব্যাপারী। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল সালাম বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী এবং ভারত থেকে পাসপোর্টযোগে দেশে ফিরছিলেন। তার পাসপোর্ট নম্বর এ০৯৬১২০১৫।
সাধারণ যাত্রীর মতোই তিনি সীমান্ত অতিক্রম করছিলেন। কিন্তু কাস্টমসের উন্নত স্ক্যানিং ব্যবস্থায় তার লাগেজে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়ে। এরপরই শুরু হয় বিস্তারিত তল্লাশি।
লাগেজে লুকানো ছিল কানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান ডলার
কাস্টমস কর্মকর্তারা তল্লাশি চালিয়ে লাগেজের ভেতর থেকে উদ্ধার করেন ৩২ হাজার ২০০ কানাডিয়ান ডলার এবং ৩৬ হাজার ৪০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। মুদ্রাগুলো এমনভাবে লুকানো ছিল যে বাইরে থেকে সহজে বোঝার কোনো সুযোগ ছিল না। বিশেষ কৌশলে প্যাকেট করে লাগেজের ভেতরের অংশে সংরক্ষণ করা হয়।
উদ্ধারকৃত বৈদেশিক মুদ্রার মোট বাজারমূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০ লাখ টাকা বলে প্রাথমিকভাবে হিসাব করেছে কাস্টমস। এই অঙ্কের অর্থ ঘোষণা ছাড়াই সীমান্ত পার করার চেষ্টা করা স্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘনের শামিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল সালাম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে কাস্টমস সূত্র। তিনি স্বীকার করেছেন যে কলকাতায় অবস্থানকালে ‘সুমন’ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা গ্রহণ করেন।
তার ভাষ্যমতে, এই অর্থ বাংলাদেশে এনে যশোরে অবস্থানরত আরেক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। তবে সেই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি বা দিতে চাননি। কাস্টমস কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন।
এই স্বীকারোক্তি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা যাত্রীদের ব্যবহার করে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছে।
বৈদেশিক মুদ্রা পাচার ও আইনি দিক
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সীমার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ঘোষণা ছাড়া বহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষ করে যাত্রী ব্যাগেজ ব্যবহার করে এভাবে লুকিয়ে অর্থ আনা সরাসরি মুদ্রা পাচারের আওতায় পড়ে।
এই ধরনের অপরাধ দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, অবৈধভাবে আনা অর্থ হুন্ডি, কালো টাকা সাদা করা কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের ঝুঁকি থাকে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানায়, উদ্ধার করা বৈদেশিক মুদ্রা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের বক্তব্য
বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমসের সহকারী কমিশনার অতুল কুমার এ বিষয়ে জানান, নিয়মিত স্ক্যানিং কার্যক্রমের সময় যাত্রীর লাগেজে সন্দেহজনক চিহ্ন ধরা পড়ে। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তল্লাশি চালিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চালানটি উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় সিজারলিস্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি, এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তদন্ত জোরদার করা হচ্ছে।
বেনাপোল সীমান্তে কাস্টমস নজরদারি জোরদার
সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য পাচারের চেষ্টা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এজন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ স্ক্যানিং ব্যবস্থা আধুনিক করেছে এবং সন্দেহভাজন যাত্রীদের ওপর বাড়তি নজরদারি চালাচ্ছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো, কাস্টমসের নিয়মিত তৎপরতা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে বড় ধরনের পাচার চেষ্টাও ব্যর্থ করা সম্ভব। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য এটি একটি স্পষ্ট বার্তা যে, আইন ভঙ্গ করে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করলে রেহাই নেই।
পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এককভাবে যাত্রী আটক করলেই সমস্যা সমাধান হবে না। এর পেছনে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে সীমান্ত দিয়ে পাচারের চেষ্টা বারবার চলতেই থাকবে।
বেনাপোলের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক পাচার চক্র কতটা সংগঠিত এবং কৌশলী হতে পারে। তাই কাস্টমস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ সময়ের দাবি।


