২১ বছর আগে বেনাপোলের পোড়াবাড়ি নারায়ণপুর গ্রামের এক মোটরসাইকেলচালক সুজায়েতুজ্জামান প্রিন্সকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে অবশেষে যশোরের আদালত এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষণা করেছেন। আসামিদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্সের নিজের দুলাভাই ও উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান মিজান, যিনি এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত।
রায় ঘোষণা ও দণ্ডের বিবরণ
বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫ সালে, যশোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ জয়ন্তী রানী দাস এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত চার আসামির প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
আসামিদের পরিচয়
এই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত চারজন হলেন:
- মিজানুর রহমান মিজান, পিতা আক্কাস আলী মোড়ল, গ্রাম আমতলা গাতীপাড়া, শার্শা
- ইকবাল হোসেন, পিতা গোলাম মন্ডল, গ্রাম ভাটাডাঙ্গা, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ
- সেকেন্দার, পিতা কালু ওরফে ঘাড়কাটা কালু, গ্রাম কাগজপুকুর, বেনাপোল
- জসিম, পিতা আব্দুল করিম, একই গ্রাম কাগজপুকুর, বেনাপোল
রায়ের সময় মিজান ও সেকেন্দার আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্য দুই আসামি পলাতক থাকায়, আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন বলে জানিয়েছেন মামলার অতিরিক্ত পিপি আব্দুর রাজ্জাক।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি
২০০৪ সালের ২০ আগস্ট, প্রিন্স নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন এবং আর ফেরেননি। পরিবার ও স্বজনরা তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাতে থাকেন। পরদিন সকালে ছোট নিজামপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেতে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর, নিহতের মামা বকতিয়ার আলী বেনাপোল পোর্ট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন, প্রিন্সের মোটরসাইকেলের প্রতি মিজানের আগ্রহ ছিল, যা তাঁকে সন্দেহের তালিকায় আনতে সাহায্য করে।
তদন্ত ও চার্জশিট
এই মামলার তদন্তে উঠে আসে, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রিন্সকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল মোটরসাইকেল ছিনতাই। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আফজাল হোসেন চারজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন।
তদন্তে প্রমাণ হয়, মিজানসহ অন্যরা প্রিন্সকে ডেকে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রিন্সের মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া, যা সমাজে লোভ এবং আত্মঘাতী বিশ্বাসঘাতকতার নির্মম চিত্র তুলে ধরে।
দীর্ঘ ২১ বছরের বিচারপ্রক্রিয়া
এই মামলাটি বিচারাধীন থাকায় প্রিন্সের পরিবার দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করেছে। নানা কারণে মামলা পিছিয়েছে, আসামিদের পলাতক থাকা, বিচারক বদল, তদন্তের গতি হ্রাস—সব মিলিয়ে মামলা ঝুলে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক বার্তা
রায়ের পর নিহতের পরিবার এবং স্থানীয় সমাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। অনেকে বলেছেন, “বিচার বিলম্বিত হলেও অস্বীকৃত হয়নি।” এই রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, যে আইনের হাত অনেক দীর্ঘ, এবং অপরাধী যত বড়ই হোক, একদিন বিচারের মুখোমুখি হবেনই।


