যশোরের মণিরামপুরে চরমপন্থী সদস্য রানা প্রতাপ বৈরাগীকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছে কারাগারে। কারাগারে আটক শীর্ষ এক চরমপন্থী নেতার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে। চরমপন্থীদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ঘেরের চাঁদা আদায় নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
রানা হত্যাকান্ড নিয়ে এমন গুঞ্জন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রও এই তথ্য জানিয়েছে। তবে হত্যাকান্ডের কারণ এবং কারা জড়িত সে সম্পর্কে পুলিশ এখনও কোনো তথ্য উদ্ঘাটন বা কাউকে আটক করতে পারেনি। হত্যার ঘটনায় নিহত রানার পিতা মামলা দায়ের করেছেন।
সোমবার (০৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মণিরামপুরের কপালিয়া বাজারে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা গুলি করে ও গলাকেটে হত্যা করে চরমপন্থী সদস্য রানা প্রতাপ বৈরাগীকে (৪৫)। নিহত রানা প্রতাপ পার্শ্ববর্তী কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, কপালিয়া বাজারে রানার একটি বরফ তৈরির কারখানা রয়েছে। এছাড়া কেশবপুর উপজেলার কাটাখালী বাজারে তার একটি মাছের আড়ৎও রয়েছে। রানা প্রতাপ বৈরাগীর বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি কেশবপুর উপজেলার চুয়াডাঙ্গা কৃষ্ণনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। চার বছর আগে তিনি অবসরে যান। রানা প্রতাপ বৈরাগীরা দুই ভাইবোন। বোনের বিয়ে হয়েছে। রানা প্রতাপের ১০ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
তুষার কান্তি বৈরাগী বলেন, রানার বরফকলের ব্যবসার পাশাপশি মাছের আড়তের ব্যবসা আছে। এ ছাড়াও সে গান বাজনা করতো। সোমবার কপালিয়া বাজারের বরফকলে যাওয়ার কথা বলে সে মোটরসাইকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে তার মৃত্যু সংবাদ পান।
পুলিশ জানায়, সোমবার বিকেলে রানা প্রতাপ বৈরাগী মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে তার বরফকলে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে আসা তিন দুর্বৃত্ত তাকে বরফকল থেকে ডেকে কপালিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনের গলিতে নিয়ে যায়। এরপর দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে পালিয়ে যায়।
গুলিবিদ্ধ ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা মামলা এবং কেশবপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা রয়েছে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় রানা প্রতাপের পিতা তুষার কান্তি বৈরাগী মঙ্গলবার মণিরামপুর থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে পুলিশ এখনও কোনো আসামি আটক করতে পারেনি।
তবে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চরমপন্থী সংশ্লিষ্টতা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার-চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধে রানা প্রতাপ খুন হতে পারেন। চরমপন্থী সংগঠনের সাথে রানার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। ঘের-ভেড়ি সংশ্লিষ্ট ওই এলাকার এক শীর্ষ চরমপন্থীর ‘ডানহাত’ ছিলেন রানা। ওই চরমপন্থী নেতা ভারতে খুন হয়ে যান। সেই হত্যাকান্ডে রানার হাত ছিল বলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রচার রয়েছে। নেতা নিহত হওয়ার পর তার অস্ত্রভান্ডার চলে যায় রানার হাতে।
একইসাথে তিনি ওই এলাকার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেন। এ নিয়ে অন্তঃর্দ্ব›দ্ব শুরু হয়। এদিকে, ভারতে খুন হয়ে যান ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের সংসদ সদস্য আনারুল আজীম আনার। এই হত্যাকান্ড জড়িত অভিযোগে খুলনা অঞ্চলের এক শীর্ষ চরমপন্থী আটক হন। সেই চরমপন্থী নেতার অনুসারীদের সাথেও বিরোধ সৃষ্টি হয় রানার।
সূত্র জানিয়েছে, ঘাতকরা রানার পরিচিত ছিলেন। বরফকল থেকে ডেকে নিয়ে দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে সাত রাউন্ড গুলি করেছে। একইসাথে গলাকেটে হত্যা নিশ্চিত করে চলে গেছে। হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এর মধ্যে রানার বান্ধবী হিসেবে পরিচিত স্থানীয় একটি বিউটি পার্লারের স্বত্বাধিকারী ঝুমুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রজিউল্লাহ খান বলেন, রানা প্রতাপ বৈরাগীর হত্যার ঘটনায় তার পিতা বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে হত্যার কারণ এখনও উদঘাটন করা যায়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ হত্যাকান্ডে এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
মণিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ইমদাদুল হক বলেন, রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যার কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রæত এ হত্যার কারণ উদঘাটন সম্ভব হবে। হত্যাকারীদের ধরতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম একযোগে কাজ করছে।


