ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়নি। তবু দেশের নানা প্রান্তে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। উত্তরের জেলা বগুড়ায় সেই আমেজ যেন আরও বেশি স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় এবার নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দুই দলই নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। একদিকে বিএনপি বলছে বগুড়া তাদের রাজনীতির তীর্থস্থান, অন্যদিকে জামায়াতের দাবি—এই জেলা আদতে তাদেরই আদি দুর্গ।
বগুড়ার সাত আসনে ত্রিমুখী নয়, মূল লড়াই দুই দলের
বগুড়ায় মোট সাতটি সংসদীয় আসন। কাগজে-কলমে এখানে নয়টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী থাকলেও ভোটারদের ধারণা, বাস্তব লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই। জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণফোরাম, এলডিপি কিংবা বাম দলগুলো মাঠে থাকলেও তারা মূল প্রতিযোগিতার বাইরে থাকবে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে দুই থেকে তিনটি আসনে জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে—এমন আলোচনা এখন চায়ের দোকান থেকে হাটের মাঠ পর্যন্ত।
তারেক রহমানের প্রার্থী হওয়ায় বাড়তি গুরুত্ব বগুড়া সদরে
বগুড়া সদর আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবার এই আসন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় কেন্দ্রীয় মনোযোগ আরও বেড়েছে। জামায়াতও এখানসহ সবকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ফলে সদর আসনটি পরিণত হয়েছে মর্যাদার লড়াইয়ে।
জামায়াতের নেতারা বলছেন, অতীতের নির্বাচনের ইতিহাসই প্রমাণ করে বগুড়ায় তাদের গভীর শিকড় রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির দাবি, জনপ্রিয়তা আর সাংগঠনিক শক্তিতে তারা এখনো অনেক এগিয়ে।
ভোটারদের মূল চাওয়া একটাই—নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও বগুড়ার ভোটারদের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দাবি। বগুড়া সদর থেকে গাবতলী, সারিয়াকান্দি কিংবা শেরপুর—সবখানেই মানুষের এক কথা। তারা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে চান, কাউকে ভয় না পেয়ে, আগেই ভোট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছাড়া।
একজন কৃষক বলছিলেন, জীবনে খুব কমবারই ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাই এবার ভোটটা নিজের হাতে দিতে চান। এই অনুভূতি শুধু তার নয়, অনেকেরই।
কেন এখনো সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা?
গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে থাকলেও ভোট নিয়ে শঙ্কা কাটেনি পুরোপুরি। প্রবীণ ভোটাররা বলছেন, সাধারণ সময়ে পরিবেশ ভালো থাকলেও ভোট এলেই পরিস্থিতি বদলে যায়। মাঠের রাজনীতি তখন অন্য রূপ নেয়।
এক কর্মজীবী নারী ভোটারের ভাষায়, বড় নেতারা ভালো কথা বললেও মাঠপর্যায়ের ছোট নেতাদের আচরণেই মূল সমস্যা তৈরি হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ এবার আশঙ্কা প্রকাশ করছে, আবারও যেন অতীতের পুনরাবৃত্তি না হয়।
বিএনপির ঘাঁটি কতটা নিরাপদ?
বগুড়া দীর্ঘদিন ধরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। গাবতলী এলাকায় জিয়াউর রহমানের গ্রামের বাড়ি থাকায় এখানে বিএনপির অবস্থান বরাবরই শক্ত। বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসনকে বিএনপির সবচেয়ে নিরাপদ আসন হিসেবে ধরা হয়।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এবং পরে প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়টি শুরুতে কিছুটা হতাশা তৈরি করলেও তারেক রহমানের সক্রিয় উপস্থিতিতে নেতাকর্মীরা আবার চাঙা হয়েছেন বলে দাবি বিএনপির।
বগুড়া-৩, বগুড়া-১ এবং বগুড়া-৫ আসনেও বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলে দলীয় নেতাদের ধারণা। তবে বগুড়া-৫ আসনে জামায়াত শক্ত প্রার্থী দেওয়ায় সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
বগুড়া-২ আসনে জোটের অঙ্কে জটিলতা
বগুড়া-২ আসন নিয়ে বিএনপি জোটের ভেতরেই কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়ন বাতিল ও পরে পুনর্বহাল হওয়ায় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি জোট। এই অনিশ্চয়তা ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
অতীত ফলাফল কী বলছে?
গত তিন দশকে বগুড়ার বেশিরভাগ আসন বিএনপির দখলে ছিল। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুইটি আসনে জয় পায়, যা বিএনপির দুর্গে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়েছিল। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় সেই জায়গা পূরণে এগিয়ে এসেছে জামায়াত।

জামায়াতের দাবি—বগুড়া তাদের আদি দুর্গ
জামায়াতে ইসলামী বলছে, ইতিহাস তাদের পক্ষেই কথা বলে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনের ফলাফল তুলে ধরে তারা দাবি করছে, বগুড়ার একাধিক আসনে তাদের শক্ত অবস্থান ছিল।
শিবগঞ্জ, কাহালু-নন্দীগ্রাম এবং সদর আসনে জামায়াতের সংগঠন বরাবরই সক্রিয় ছিল বলে স্থানীয়দের মত। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের সাফল্যও তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
শহর জামায়াতের নেতারা বলছেন, জোটের রাজনীতির কারণে তারা আগে সব আসনে লড়তে পারেননি। এবার পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তাদের বিশ্বাস, শুধু ধর্মীয় ভোটার নয়, ভিন্ন মতের ভোটাররাও সুশাসনের প্রত্যাশায় তাদের দিকে ঝুঁকবে।
নাগরিক সমাজ কী বলছে?
সুশাসনের জন্য নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, বগুড়ায় এবার সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যেতে পারে। প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হলে অনেক আসনের চিরাচরিত হিসাব বদলেও যেতে পারে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বগুড়া এখন উত্তরের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত জেলা। বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই নিজেদের শক্ত অবস্থান নিয়ে আশাবাদী। তবে শেষ পর্যন্ত সব হিসাব বদলে দিতে পারে একটি বিষয়ই। সেটি হলো ভোটারদের অবাধ ও নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ। সেই সুযোগ নিশ্চিত হলে ব্যালটই বলে দেবে, বগুড়া কার দুর্গ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।


