১৪ ফেব্রুয়ারি মানেই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। একই সঙ্গে বসন্তের আগমনী বার্তা। এই সময়টায় যশোরের গদখালী এলাকায় উৎসবের আমেজ থাকার কথা। মাঠজুড়ে ফুটে থাকা রঙিন ফুল কাটার ব্যস্ততা, হাটে পাইকারদের ভিড়, ট্রাকে ট্রাকে ফুল যাচ্ছে ঢাকা–চট্টগ্রামে—এটাই ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু এ বছর সেই ছবিটা একদম উল্টো। নির্বাচনের কারণে বাজার ও পরিবহন বন্ধ থাকায় ফুলচাষিদের মুখে হাসির বদলে নেমে এসেছে হতাশার ছায়া।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী-পানিসারা অঞ্চলকে অনেকেই “ফুলের রাজধানী” বলে চেনেন। এখানকার উৎপাদিত ফুল দেশের মোট চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে যে ফুল যায়, তার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে।
প্রতিদিন ভোরে গদখালীর ফুলের হাট বসে। সূর্য ওঠার আগেই চাষিরা ফুল নিয়ে হাজির হন। পাইকাররা দাম হাঁকেন, দরদাম চলে, তারপর ট্রাকে করে ফুল ছুটে যায় বড় শহরের দিকে। ভালোবাসা দিবস আর বসন্ত বরণকে ঘিরে সাধারণত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই বিক্রি বাড়তে থাকে। কিন্তু এ বছর সেই ধারাটা ভেঙে গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে প্রশাসনের নির্দেশে কয়েকদিন ফুলের বাজার বন্ধ রাখা হয়। পরিবহন চলাচলও সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতেই চাষিরা ফুল বিক্রি করতে পারেননি।
ভাবুন তো, আপনি সারা বছর কষ্ট করে একটা ফসল ফলালেন, ঠিক যখন বিক্রি করে লাভ করার সময়—তখন বাজার বন্ধ। ফুলের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও কঠিন। কারণ ধান-গমের মতো এগুলো জমিয়ে রাখা যায় না। সময়মতো না কাটলে বা না বিক্রি হলে ফুল নষ্ট হয়ে যায়।
সরেজমিনে গদখালীর আশপাশের হাড়িয়া, সৈয়দপাড়া, পটুয়াপাড়া ও ফুলকানন পানিসারা মাঠে দেখা গেছে রঙিন ফুলের সমারোহ। রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, গোলাপ—সবই ফুটে আছে পূর্ণ সৌন্দর্যে।
কিন্তু সমস্যা হলো, এই ফুটে থাকা ফুলই যেন এখন চাষিদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার বন্ধ থাকায় অনেকেই রজনীগন্ধা বা গ্লাডিওলাস কাটতেই পারেননি। কেউ কেউ গোলাপ কেটে কোল্ডস্টোরেজে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা দিবসে যে বাড়তি দাম পাওয়া যায়, সেটা আর মেলেনি।
পানিসারা মাঠের ফুলচাষি মো. সাইফুল ইসলাম জানালেন, তার দুই বিঘা জমিতে জারবেরার শেডে প্রায় সাত হাজার ফুল কাটার মতো প্রস্তুত ছিল। স্বাভাবিক সময়ে এগুলো বিক্রি করলে অন্তত এক লাখ টাকার মতো পাওয়া যেত। কিন্তু বাজার বন্ধ থাকায় সেই ফুল জমিতেই পড়ে আছে।
শুধু জারবেরা নয়, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা—সব ধরনের ফুলের একই অবস্থা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে অল্প কিছু ফুল নিয়ে গেলেও সঠিক দাম পাননি। ফলে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠছে না।
পটুয়াপাড়া গ্রামের শাহ জামাল বলেন, গোলাপ একদিন পরপর তুলতে হয়। ভালোবাসা দিবসে গোলাপের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। তখন দামও সারা বছরের তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু এ বছর ভোটের কারণে সেই সুযোগটাই হাতছাড়া হয়েছে।
অন্যদিকে হাড়িয়া গ্রামের এরশাদ আলী জানান, বাজারে বিক্রি করতে না পেরে কিছু গাঁদা ফুল গরুকে খাওয়াতে হয়েছে। শুনতে কষ্ট লাগে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। যে ফুল শহরে গেলে মানুষের হাতে ভালোবাসার প্রতীক হতো, তা শেষ পর্যন্ত গরুর খাবার হয়ে গেছে।
গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. মনজুর আলম জানান, মৌসুমের শুরুতে চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন বাজার বন্ধ থাকায় পুরো চেইনটাই ভেঙে গেছে। শুধু চাষি নয়, পাইকার, পরিবহন শ্রমিক, ফুল মোড়ের ব্যবসায়ী—সবারই ক্ষতি হয়েছে।
পানিসারা-হাড়িয়া ফুল মোড়ও প্রশাসনের নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়। প্রতিদিন যেখানে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হতো, সেখানে এখন কার্যত শূন্য অবস্থা।
যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, বসন্ত ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এ বছর শত কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা ছিল। সাধারণত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বড় পরিসরে বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু ৯ তারিখ থেকে বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাষিরা মাত্র তিন দিন ফুল বিক্রি করতে পেরেছেন।
সব মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রি হলেও প্রত্যাশার তুলনায় তা খুবই কম। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে ঠিক মূল সময়টায় বাজার বন্ধ থাকার কারণে।

ঝিকরগাছার গদখালী অঞ্চলে প্রায় ৮০০ হেক্টর জমিতে ১১ ধরনের ফুল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। প্রায় ছয় হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই ফুলচাষের সঙ্গে জড়িত। প্রতিবছর এখান থেকে সাড়ে তিনশ থেকে চারশ কোটি টাকার ফুল উৎপাদিত হয়।
অর্থাৎ, এই অঞ্চল শুধু ফুল নয়—একটা বড় অর্থনীতির চাকা ঘোরায়। যখন কয়েকদিনের জন্য বাজার বন্ধ থাকে, তখন তার প্রভাব পড়ে হাজার হাজার পরিবারের ওপর।
ফুলচাষিরা এখন অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার। তারা চান, ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে যেন বাজার পুরোপুরি বন্ধ না থাকে বা বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ দেওয়া হয়। কারণ ফুলের ব্যবসা সময়নির্ভর। একদিনের ক্ষতিও এখানে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়।
এই ঘটনার পর একটা বিষয় পরিষ্কার—ফুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, হাজারো পরিবারের জীবিকা। বসন্তের দিনে যেখানে হাসি ফুটার কথা ছিল, সেখানে এবার গদখালির মাঠে জমেছে আষাঢ়ের মেঘ। তবুও চাষিরা আশায় আছেন, আগামী মৌসুমে আবার রঙিন ফুলের সঙ্গে ফিরবে তাদের মুখের হাসিও।


