ঘুমের মধ্যে হঠাৎ ঠান্ডা লেগে কম্বল টেনে নেওয়া, আবার কিছুক্ষণ পর গরমে ঘেমে উঠে পাখার রেগুলেটর ঘোরানো—এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই। বিশেষ করে শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে, যখন আবহাওয়া একদম স্থির থাকে না, তখন পাখার গতি ঠিক রাখা সত্যিই ঝামেলার।
রাত তিনটায় উঠে পাখা কমানো বা বাড়ানো কারও ভালো লাগে না। কিন্তু ভাবো তো, যদি পাখা নিজেই বুঝে নিতে পারে তোমার গরম লাগছে না ঠান্ডা? ঠিক এই সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে এক অভিনব এআই ফ্যান প্রযুক্তি।
বেঙ্গালুরুর এক প্রযুক্তি কর্মী এমন একটি স্মার্ট সিস্টেম তৈরি করেছেন, যা ঘুমের সময় আপনার শরীরী ভঙ্গিমা দেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাখার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। এই আবিষ্কার ইতিমধ্যেই প্রযুক্তি মহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে।
আমরা যখন ঘুমাই, তখন আমাদের শরীর নিজেই অনেক সংকেত দেয়। যেমন, গরম লাগলে হাত-পা কম্বলের বাইরে চলে আসে। ঠান্ডা লাগলে আমরা শরীর গুটিয়ে ফেলি। এই স্বাভাবিক অভ্যাসকেই কাজে লাগিয়েছে নতুন এই AI-চালিত স্মার্ট ফ্যান সিস্টেম।
আবিষ্কারকের নাম পঙ্কজ। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, ভোর রাতে বারবার উঠে পাখার স্পিড কমাতে কমাতে তিনি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। তখনই তাঁর মাথায় আসে অভিনব আইডিয়া—কেন না প্রযুক্তিকেই দায়িত্ব দেওয়া যায়?
তিনি একটি সিস্টেম তৈরি করেন, যা তাঁর ঘুমন্ত অবস্থার উপর নজর রাখে। যদি তাঁর হাত বা পা কম্বলের বাইরে থাকে, সিস্টেম ধরে নেয় যে তাঁর গরম লাগছে। সঙ্গে সঙ্গে পাখার গতি বাড়িয়ে দেয়। আর যদি তিনি শরীর গুটিয়ে শুয়ে থাকেন, তাহলে সিস্টেম বুঝে নেয় ঠান্ডা লাগছে এবং পাখা ধীরে করে বা বন্ধ করে দেয়।
এটা শুনতে সিনেমার মতো লাগলেও বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ কার্যকর।
এই স্মার্ট ফ্যান সিস্টেমের মূলে রয়েছে একটি ছোট কিন্তু শক্তিশালী ডিভাইস—রাস্পবেরি পাই হোম সার্ভার। এর সঙ্গে যুক্ত আছে একটি মিডিয়াপাইপ পোজ ভিশন মডেল, যা রিয়েল টাইমে মানুষের শরীরের ভঙ্গিমা শনাক্ত করতে পারে।
সহজ করে বললে, একটি ক্যামেরা আপনার ঘুমের ভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে। সফটওয়্যার সেই ছবি বিশ্লেষণ করে বুঝে নেয় আপনি কেমন অবস্থায় আছেন। তারপর সেটি সঙ্গে সঙ্গে পাখাকে কমান্ড পাঠায়—চালু করো, গতি বাড়াও, অথবা বন্ধ করো।
পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়। আপনাকে কিছুই করতে হবে না। না রেগুলেটর ঘোরাতে হবে, না ঘুম ভাঙাতে হবে।
এটাই আসল অর্থে স্মার্ট হোম অটোমেশন।
আজকের পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) শুধু বড় বড় কোম্পানির গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। মোবাইল ফোনের ফেস আনলক থেকে শুরু করে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, সবকিছুতেই এআই কাজ করছে।
এবার সেই তালিকায় যোগ হলো এআই ফ্যান কন্ট্রোল সিস্টেম।
ভাবো তো, তোমার বাড়ির আলো, এসি, পাখা—সবকিছু যদি তোমার অভ্যাস বুঝে নিজে থেকেই কাজ করে, তাহলে জীবন কত সহজ হয়ে যাবে! গরমে ঘামতে হবে না, আবার ঠান্ডায় কাঁপতেও হবে না।
এই প্রযুক্তি শুধু আরামই দেবে না, বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ পাখা অযথা সারারাত ফুল স্পিডে চলবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী গতি বদলাবে।
বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। কারণ তারা জানে, ভবিষ্যৎ এই প্রযুক্তির হাতেই। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই এআই দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে।
এই এআই-চালিত পাখা তারই একটি ছোট কিন্তু বাস্তব উদাহরণ।
আমরা আগে ভাবতাম, এআই মানে শুধু চ্যাটবট বা রোবট। এখন দেখা যাচ্ছে, এটি আমাদের ঘুমের মানও উন্নত করতে পারে। মানে, প্রযুক্তি শুধু কাজের জন্য নয়, আরাম আর স্বাস্থ্যের জন্যও কাজ করছে।
ভালো ঘুম আমাদের শরীর ও মনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাপমাত্রা ঠিক না থাকলে ঘুম বারবার ভেঙে যায়। একবার ঠান্ডা, একবার গরম—এভাবে রাত কেটে গেলে সকালে উঠে ক্লান্ত লাগে।
এআই ফ্যান এই সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে। কারণ এটি আপনার শরীরের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আপনি গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম উপভোগ করতে পারেন।
ভাবো তো, সকালে উঠে যদি সতেজ অনুভব করো, তাহলে পুরো দিনটাই অন্যরকম ভালো যাবে।
আজ পাখার গতি নিয়ন্ত্রণ করছে এআই। কাল হয়তো আপনার বিছানার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে, জানালা খুলবে বা বন্ধ করবে, এমনকি আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তাও দেবে।
এই উদ্ভাবন দেখিয়ে দিল, বড় বড় ল্যাব বা কোটি টাকার বিনিয়োগ ছাড়াও একজন প্রযুক্তি কর্মী নিজের প্রয়োজন থেকেই বিশ্বকে নতুন সমাধান দিতে পারেন।
এটাই প্রযুক্তির আসল সৌন্দর্য।
সময় বদলাচ্ছে। আমাদের জীবনযাত্রাও বদলাচ্ছে। হাতে ঘুরিয়ে রেগুলেটর কমানো-বাড়ানোর দিন হয়তো ধীরে ধীরে শেষের পথে। তার জায়গা নিচ্ছে এআই-চালিত স্মার্ট ফ্যান প্রযুক্তি, যা আপনার শরীরী ভাষা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে।
ঘুমের মধ্যে আর বিরক্ত হয়ে উঠতে হবে না। প্রযুক্তি আপনার পাশে থাকবে, নীরবে কাজ করবে।
এক কথায় বলতে গেলে, এটা শুধু একটি পাখা নয়—এটা ভবিষ্যতের আরামদায়ক জীবনের এক ঝলক।



