জাপান পৃথিবীর অন্যতম শৃঙ্খলাপূর্ণ ও সংস্কৃতিসম্পন্ন দেশ। এখানে মানুষের জীবনযাত্রা, আচরণবিধি এবং সামাজিক সংবেদনশীলতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক আলাদা। ভ্রমণ কিংবা কাজের জন্য যদি আপনি জাপান যাচ্ছেন, তবে আপনার জানা উচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিয়মের মধ্যে একটি — চড়া সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার এড়ানো।
এই বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাপানে গন্ধ হয়রানি বা সুমেহারা (Sumehara) নামে পরিচিত একটি সামাজিক অপরাধের সঙ্গেও সম্পর্কিত। নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
বিশ্বজুড়ে বেশিরভাগ দেশে সুগন্ধি ব্যবহারকে ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখা হয়। কেউ হালকা সুগন্ধি পছন্দ করেন, আবার কেউবা তীব্র পারফিউম ব্যবহার করতে ভালোবাসেন।
কিন্তু জাপানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে চড়া গন্ধের পারফিউমকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। জাপানি সমাজের বড় একটি অংশ মনে করে, তীব্র সুগন্ধি অন্যের ব্যক্তিগত আরাম ও মানসিক স্বস্তিতে হস্তক্ষেপ করে। ফলে অনেকে একে অসৌজন্যমূলক আচরণ হিসেবেই গণ্য করেন।
জাপানে “সুমেহারা” (スメハラ) শব্দটি এসেছে দুটি জাপানি শব্দ থেকে — “Sume” (সুগন্ধি) এবং “Hara” (হয়রানি)। এর অর্থ হলো গন্ধ দ্বারা হয়রানি।যদি আপনার পারফিউমের গন্ধ অত্যধিক তীব্র হয়,অথবা সহকর্মী কিংবা আশেপাশের মানুষ সেটিতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে আপনাকে গন্ধ হয়রানিকারী হিসেবে দেখা হতে পারে।
এমনকি চরম ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে অভিযোগও দায়ের হতে পারে। কিছু প্রতিষ্ঠান তো কর্মীদের জন্য আলাদা সুগন্ধি নীতিমালাও তৈরি করেছে।
জাপানের সমাজে শৃঙ্খলা, শালীনতা এবং অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু অলিখিত নিয়ম মেনে চলা হয়: চড়া গন্ধের পারফিউম এড়িয়ে চলুন, তীব্র গন্ধের সুগন্ধি ব্যবহারকে অসভ্যতা হিসেবে ধরা হয়।হালকা ও প্রাকৃতিক ঘ্রাণই জনপ্রিয়, জাপানিরা সাধারণত হালকা, সতেজ এবং প্রায় অদৃশ্য সুগন্ধি পছন্দ করেন।পারফিউম নাও ব্যবহার করা যেতে পারে, অনেক জাপানি সুগন্ধি একেবারেই ব্যবহার করেন না, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে।সহকর্মীদের প্রতি সচেতন থাকুন, অফিস, ট্রেন বা অন্যান্য জনবহুল স্থানে অন্যদের আরামের কথা মাথায় রাখা জরুরি।
সম্প্রতি ভারতের এক মহিলা চাকরিসূত্রে জাপানে যান। তিনি একদিন অফিসে চড়া গন্ধের পারফিউম ব্যবহার করেছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর এক সহকর্মী এটি গন্ধ হয়রানি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঘটনায় বিব্রত ওই মহিলা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে অন্যদের সতর্ক করেছেন। তাঁর পরামর্শ স্পষ্ট —“জাপানে গেলে তীব্র সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। এখানে তা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।”
জাপানি সমাজের এ সংবেদনশীলতার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে: সংকীর্ণ ব্যক্তিগত পরিসর: জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় মানুষ প্রায়ই কাছাকাছি অবস্থান করেন।গোপনীয়তা ও সৌজন্যবোধ: জাপানিরা অন্যের আরামের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী।সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: ঐতিহ্যগতভাবে জাপানি ঘ্রাণ-সংস্কৃতি খুবই সূক্ষ্ম ও প্রাকৃতিকতাবাদী।
যদি আপনি জাপান ভ্রমণ, কাজ বা পড়াশোনার জন্য যাচ্ছেন, তাহলে কিছু ছোট টিপস মেনে চলুন: হালকা ও সতেজ পারফিউম ব্যবহার করুন, কোনও সুগন্ধি ব্যবহার না করাই ভালো — বিশেষ করে অফিস, মেট্রো বা রেস্তোরাঁয়, সাথে থাকুক ডিওডোরেন্ট — গন্ধ নিয়ন্ত্রণে রাখবে, কিন্তু সুগন্ধি হবে না, জাপানি সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন থাকুন।


