বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন সাবেক সচিব ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রশাসনের গভীর সংকট, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং সরকারি দপ্তরগুলোর ভেতরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির জাল।
দুর্নীতির প্রমাণ গোপন, ব্যবস্থা নেই
শুক্রবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে আব্দুস সাত্তার অভিযোগ করেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টার সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আছে, তবুও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তিনি দাবি করেন, এসব উপদেষ্টার অনুমতি ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা বদলি হয় না।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন উপদেষ্টার এপিএসের ব্যাংক হিসাবে ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে, কিন্তু কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পদায়ন ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রশ্ন
আব্দুস সাত্তার তীব্র প্রশ্ন তোলেন—
- নূরজাহান বেগমের মতো অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তির হাতে কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থাকা উচিত?
- অভিজ্ঞতা ছাড়াই স্থানীয় সরকার ও যুব ও ক্রীড়া—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া কি যৌক্তিক?
তার এসব বক্তব্যে সেমিনারে উপস্থিত কর্মকর্তারা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানান।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও দুর্নীতি বৃদ্ধি
আব্দুস সাত্তারের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও দুর্নীতি কমেনি; বরং বেড়েছে। তিনি ভূমি ও উপজেলা পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার ঘুষ দাবির উদাহরণ দেন—
- এক সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি স্কুলের জমির নামজারিতে ৩০ লাখ টাকা দাবি করেছেন।
- ঢাকার পাশের এক ইউএনও একটি কারখানার লে–আউট পাস করতে ২০ লাখ টাকা চেয়েছেন।
দলীয় অফিসে ইন–সার্ভিস কর্মকর্তাদের আগমন
তিনি জানান, গত বছর ৫ আগস্টের পর হাজার হাজার কর্মকর্তা–কর্মচারী তার রাজনৈতিক দলের অফিসে ভিড় করতে শুরু করেন। বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি ভালোভাবে নেননি এবং ইন–সার্ভিস কর্মকর্তাদের অফিসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে গেটে নোটিশ টাঙানো হয়।
সাবেক সচিবদের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আব্দুস সাত্তার দায়িত্বশীল ব্যক্তি, প্রমাণ ছাড়া তিনি এ ধরনের অভিযোগ তোলেন না। তাই সরকারকে অবশ্যই খুঁজে বের করা উচিত—এই আট উপদেষ্টা কারা।
সেমিনারে উঠে আসা মূল বক্তব্য
সাড়ে তিন ঘণ্টার এই সেমিনারে গত ১৫ বছরের প্রশাসনিক অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়। বক্তারা জানান—
- আইনের ঘাটতি নয়, বরং এর প্রয়োগ ও সাহসের অভাবই বড় সমস্যা।
- কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পক্ষপাত অতীতে অনেককে অন্যায়ের শিকার করেছে।
শহীদ পরিবারের বক্তব্য
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
- সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী বলেন, অতীতে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পক্ষপাত শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে।
- সানজিদা খান দ্বীপ্তি চান, তার ছেলে শাহরিয়ার খানের লেখা চিঠি আগামী বছর থেকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হোক, যাতে নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে জানে।
- মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ অভিযোগ করেন, ভাই মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের মৃত্যুর পর সরকার তাদের গণভবনে যেতে চাপ দেয়, কিন্তু তারা অস্বীকার করেন।
জনপ্রশাসন সচিবের মন্তব্য
জনপ্রশাসন সচিব মোখলেস উর রহমান বলেন, কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও কাজের ফল মিলছে না, কারণ সাহসের অভাব রয়ে গেছে। দেশে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট; এখন দরকার তার সঠিক প্রয়োগ। তিনি জানান, শাহরিয়ার খানের চিঠি আগামী বছর পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পর্যবেক্ষণ
ঢাবি উপাচার্য বলেন, গত সরকারের সময় রাজনীতিবিদেরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছেন। ভালো কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলেছে—মানুষ এখন প্রশ্ন করতে শিখেছে। প্রশাসনকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিবের সতর্কবার্তা
তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা জুলাই অভ্যুত্থানে পৌঁছেছে। গত ১৬ বছরে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন কর্মকর্তাদের ঠিক করতে হবে তারা পুরনো পথে হাঁটবেন নাকি নতুন পথে।


