আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রোববার কক্সবাজারে জেলা প্রশাসনের আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যেই এবার যৌথবাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান করা হচ্ছে।
নির্বাচনকে ঘিরে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান কেন জরুরি
নির্বাচনের সময় সাধারণত অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কমিশনার সানাউল্লাহ জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্র খুব শিগগিরই জারি হবে। সেই পরিপত্রের ভিত্তিতেই সারাদেশে যৌথবাহিনীর অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই অভিযান কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়; বরং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধই এর মূল উদ্দেশ্য।
যৌথবাহিনীর অভিযানের তিনটি প্রধান লক্ষ্য
নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যমতে, যৌথবাহিনীর এই বিশেষ অভিযানের তিনটি মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—
১. অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ
নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন মহল অবৈধ অস্ত্র মজুত বা সরবরাহের চেষ্টা করতে পারে। এসব অস্ত্র যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এ কারণে যৌথবাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করবে।
যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে না, সেগুলো যেন কোনোভাবেই সহিংসতা বা সন্ত্রাসে ব্যবহার না হয়—সে বিষয়েও বিশেষ নজরদারি থাকবে বলে জানান ইসি কমিশনার।
২. চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনা
যৌথবাহিনীর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন সব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, যারা অতীতে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
৩. নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বড় ধরনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো যৌথবাহিনী সরাসরি দেখবে। তবে ছোটখাটো বা নিয়মিত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটিগুলো ব্যবস্থা নেবে।
এর ফলে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলো আচরণবিধি মানতে আরও সচেতন হবে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন।
সব বাহিনী প্রস্তুত, হেডকোয়ার্টারগুলোকে নির্দেশনা
ইসি কমিশনার জানান, যৌথবাহিনীর এই অভিযানের বিষয়ে সব বাহিনী প্রধানকে নিয়ে ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ সংশ্লিষ্ট সব বাহিনীর হেডকোয়ার্টারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “সব বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।”
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত নিরাপত্তায় বিশেষ সতর্কতা
নির্বাচন কমিশনার রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সিল করে দিতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। পাশাপাশি স্থল সীমান্ত ও সাগরপথে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
তার ভাষায়, “কোনোভাবেই দুষ্কৃতিকারীরা যেন সীমান্ত বা ক্যাম্প ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে। এ বিষয়ে কোনো গাফিলতি চলবে না।”
সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব সবাইকে ভোগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন ভালো করতে না পারলে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই এর পরিণতি বহন করতে হবে। তাই সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।”
ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থা ফেরাতে ইসির দৃঢ় অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবৈধ অস্ত্র, সন্ত্রাস ও ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে এবং নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌথবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি নির্বাচনী সহিংসতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


