বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মরদেহ আজ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো গাড়িতে করে জানাজার উদ্দেশ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই দৃশ্য শুধু একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয়, এটি ছিল দেশের ইতিহাসের এক আবেগঘন মুহূর্ত। সকাল থেকেই রাজধানীর আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে শোক আর নীরবতার অনুভূতিতে।
আজ বুধবার সকাল ১১টা ০৪ মিনিটে গুলশানের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িবহর বের হয়। গাড়িটি ছিল জাতীয় পতাকায় মোড়ানো। ধীরগতিতে এগিয়ে চলা গাড়িবহর যেন পুরো রাজধানীকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দেয়।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ নীরবে তাকিয়ে ছিলেন, অনেকের চোখে ছিল জল। কেউ হাত তুলেছেন দোয়ার জন্য, কেউ আবার মাথা নত করে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
এই যাত্রাপথে শুধু একটি গাড়ি নয়, ছিল একটি ইতিহাস। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সাক্ষী এই নেত্রীর শেষ যাত্রা দেখতে মানুষ ভিড় জমায় রাস্তার দুই পাশে।
গাড়িবহরে লাল-সবুজ রঙের একটি বাসও ছিল, যেখানে পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা জানাজাস্থলে যাচ্ছিলেন। পরিবারের উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আরও আবেগময় করে তোলে।
রাজনীতির বাইরে একজন স্ত্রী, একজন মা ও একজন পরিবারের মানুষ হিসেবে খালেদা জিয়াকে বিদায় জানাতে পরিবারের সদস্যদের মুখে ছিল গভীর শোকের ছাপ। অনেকেই নীরবে চোখ মুছেছেন, আবার কেউ কেউ একে অপরকে সান্ত্বনা দিয়েছেন।
গাড়িবহরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও খালেদা জিয়ার নিকট আত্মীয়স্বজনরাও ছিলেন। দলের শীর্ষ নেতারা এই শেষ যাত্রায় সরাসরি অংশ নেন। এটি ছিল দলের পক্ষ থেকে তাদের নেত্রীর প্রতি শেষ দায়িত্ব পালন।
দীর্ঘদিন ধরে যিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলনের সামনে থেকে যিনি দলকে পরিচালনা করেছেন, তার বিদায়ে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। সকাল থেকেই সেখানে দলে দলে মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। বিএনপির নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ সেখানে উপস্থিত হন। কেউ এসেছেন দলীয় পরিচয়ে, কেউ আবার এসেছেন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
সকাল সাড়ে দশটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মূল সড়ক এবং ফার্মগেটের খামারবাড়ি এলাকার মোড়ে মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল মানুষের ঢল নেমেছে। অনেকেই জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ আবার প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন।
এত বড় সমাগমকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল জোরদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে জানাজার কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়। স্বেচ্ছাসেবকরাও মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াতে সহায়তা করেন।
এই শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই মানুষ শান্তভাবে জানাজায় অংশ নেওয়ার অপেক্ষা করেন। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।
জানাজা শেষে খালেদা জিয়াকে দাফন করা হবে তার স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে। এটি একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দম্পতির নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয় বহু দশক ধরে।
অনেকেই বলছেন, স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি শায়িত হওয়ার এই মুহূর্তটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দাফনস্থলে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আসা অনেক সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে আবেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেউ বলছেন, তিনি ছিলেন আপসহীন নেত্রী। কেউ আবার বলছেন, তিনি ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন, যিনি সাহসের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন।
একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি বলছিলেন, “আমি কোনো দলের লোক না, কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেষ বিদায় দেখতে এসেছি।” এই কথাগুলোই প্রমাণ করে, খালেদা জিয়ার প্রভাব শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তার উত্থান, নেতৃত্ব, সংগ্রাম ও বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন সময়ের এক শক্তিশালী চরিত্র। আজ তার শেষ বিদায়ে মানুষের এই ঢল সেই প্রভাবেরই প্রতিফলন।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখে মুখে একটাই কথা শোনা যাচ্ছে—এই বিদায় শুধু একজন নেত্রীর নয়, এটি একটি সময়ের বিদায়। ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম থেকে যাবে, তার অবদান নিয়ে আলোচনা চলবে বহুদিন।
এই আবেগঘন পরিবেশে, নীরব দোয়া আর অশ্রুসিক্ত চোখে জাতি আজ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।


