রাজধানীর খিলক্ষেতে বসুন্ধরার কেবি কনভেনশন হলে আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা ও রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। ৮ জুলাই সারাদেশ থেকে আসা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ এখন পর্যন্ত মোট ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেছে ভাটারা থানায়।
ঘটনার পটভূমি ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য
৮ জুলাই রাজধানীর ৩০০ ফিট সংলগ্ন কেবি কনভেনশন সেন্টারে এক গোপন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজক ছিলেন কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ের কিছু আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, যারা সরকার পতনের পর রাজনৈতিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করতে চেয়েছিলেন।
তবে এই প্রশিক্ষণের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। কারণ, আয়োজকদের মধ্যে কেউ কেউ পরিচয় গোপন রেখেছিলেন এবং প্রশিক্ষণ চলাকালীন কোনো সাংবাদিক বা বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এতে সন্দেহ জন্ম নেয়, এই কর্মসূচির আড়ালে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি না।
ডিএমপির বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি
৩ আগস্ট, রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার তালেবুর রহমান বলেন—
“এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়ে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। ভাটারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রুজু হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তারে কাজ চলছে।”
তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ সারাদেশ থেকে আরও ২১ জন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সিটিটিসি ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি
রাজধানীতে যেকোনো ধরনের অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত রোধে ডিএমপি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সিটিটিসি এবং অন্যান্য গোয়েন্দা ইউনিটকে সক্রিয় করে, সাদা পোশাকে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ডিসি তালেবুর রহমান বলেন—
“আমরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। কোনো দল বা গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।”
ডিএমপির পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, কেউ যদি রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে জননিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে, তাহলে বিনা দ্বিধায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির রহস্য ঘনীভূত
যদিও এই প্রশিক্ষণকে শুরুতে একটি সাংগঠনিক প্রস্তুতির অংশ বলা হচ্ছিল, তদন্তে উঠে এসেছে বেশ কিছু সন্দেহজনক দিক:
- প্রশিক্ষণের স্থান গোপন রাখা হয়
- অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশের নাম-পরিচয় অস্পষ্ট
- প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক স্বীকৃতি নেই
- ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে কিছু অস্ত্রচালনার কৌশল ও দলীয় শপথ গ্রহণ
এছাড়াও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া কয়েকজন পূর্বে জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যার কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে ঘটনা
বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বর্তমান সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের কিছু অংশ নতুন পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে সংগঠিতভাবে দল পুনর্গঠন ও প্রতিকূল পরিবেশে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকারের বিদায়ের পর ক্ষমতা হারানো রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উগ্রতা বা চরমপন্থার উত্থান ঘটছে কি না—তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা: কেন এবং কীভাবে
ভাটারা থানায় দায়ের হওয়া মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারা অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই আইনের আওতায় রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংস প্রশিক্ষণ এবং জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ যেকোনো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—
- রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের পরিকল্পনা
- উগ্র মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা
- গোপন বৈঠক ও সহিংস প্রশিক্ষণের আয়োজন
- সরকার পতনের পর সংঘটিত হামলার প্রস্তুতি
জনগণের মাঝে উদ্বেগ ও নিরাপত্তা চাহিদা
এই ঘটনার পর রাজধানীবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর চারপাশে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। জনসাধারণও পুলিশের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
তবে অনেকে মনে করছেন, রাজনীতির নামে যদি আবার সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ জনগণ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হবে।
সরকারি অবস্থান ও ভবিষ্যৎ করণীয়
সরকারি পর্যায় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও, ডিএমপির দ্রুত ও সুসংগঠিত পদক্ষেপ স্পষ্ট করছে, সরকার এবং প্রশাসন এই ধরণের গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়।
ভবিষ্যতে যাতে:
- রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ না হয়
- প্রশিক্ষণ আয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা থাকে
- সকল রাজনৈতিক সংগঠন আইন মেনে চলতে বাধ্য হয়
এই লক্ষ্যেই সরকার কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


