ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৯ বছর ৩ মাস ১৯ দিনের বিরতির অবসান ঘটিয়ে দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। নতুন সরকারের সূচনালগ্নেই তিনি শক্তিশালী, গতিশীল এবং অভিজ্ঞতা-নির্ভর একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। ৪৯ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায় একদিকে যেমন প্রবীণ রাজনীতিবিদদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তরুণ নেতৃত্বের উদ্যমও যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রশাসনে নতুন গতি আসবে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মন্ত্রণালয় নিজের অধীনে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী। এই দপ্তরগুলো হলো প্রতিরক্ষা, জনপ্রশাসন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। সাধারণত এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
জনপ্রশাসন নিজের কাছে রাখার মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামোতে সরাসরি নজরদারি নিশ্চিত করতে চান তিনি। আবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিজের তত্ত্বাবধানে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে তরুণ সমাজকে সরকার পরিচালনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টায় সচিবালয়ে নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠক থেকেই সরকারের কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দেশের তৃণমূল উন্নয়নের ভিত্তি। তাই এই খাতে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করবেন মীর শাহে আলম।
অর্থনীতি ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশের বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন তার নেতৃত্বে এগোবে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন জোটের শরিক নেতা জোনায়েদ সাকি। অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয়গুলোতে নতুন পরিকল্পনা আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। বিচার বিভাগীয় সংস্কার ও আইন প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে থাকছেন ববি হাজ্জাজ। নতুন শিক্ষা নীতি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নে তাদের পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা তার প্রধান দায়িত্ব হবে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করবেন শামা ওবায়েদ ইসলাম।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জহির উদ্দিন স্বপনকে। প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ইয়াসের খান চৌধুরী। ডিজিটাল মিডিয়া, গণমাধ্যম নীতি ও তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন তাদের মূল লক্ষ্য।
বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন মোহাম্মদ শরীফুল আলম। শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে তারা কাজ করবেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো তাদের অগ্রাধিকার হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন এম এ মুহিত। স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, হাসপাতাল ব্যবস্থার উন্নয়ন ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন জরুরি।
কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আমিন উর রশিদ। প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কৃষকদের সহায়তা দেওয়া তাদের মূল দায়িত্ব।
পরিবেশ মন্ত্রী হয়েছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। সড়ক ও সেতু মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শেখ রবিউল আলম। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হয়েছেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ধর্মমন্ত্রী হয়েছেন মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এবং সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন নিতাই রায় চৌধুরী।
ভূমি, প্রবাসী কল্যাণ, পানিসম্পদ ও বিমান-পর্যটনসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়েও অভিজ্ঞ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গৃহায়ণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন মুখ যুক্ত হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন আব্দুল বারী এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক। তার ক্রীড়াঙ্গনের অভিজ্ঞতা এই মন্ত্রণালয়ে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—অভিজ্ঞতা ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়েই এগোবে দেশ। এখন সবার নজর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিকে। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
সময়ের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে এই মন্ত্রিসভা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। দেশের মানুষ এখন বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়—আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে নতুন সরকারের হাত ধরেই।



